Followers

Thursday, 21 December 2017

ফেসবুকে কবিতা চর্চা করুন, তবে যাচাই করুন পত্রিকায়




ফেসবুকে কবিতা চর্চা করুন, 
তবে যাচাই করুন পত্রিকায়



হামিম হোসেন মণ্ডল: কবিতাচর্চা ভালো কাজ নয় কি?
দৈনিক কলম, ১৭/১২/২০১৭
অনেকে মনে করেন – কবিতাচর্চা নাকি অযথা সময় অপচয় করার শামিল; যদি পর্যাপ্ত বা চলনসই অর্থোপার্জনের মাধ্যম না হয়ে ওঠে। যদিও যথার্থ কবিতাচর্চা মূলত কবিতা রচনা ব্যক্তিত্ব, সম্মান (সম্মাননা) প্রাপ্তি ঘটায়। যথার্থ কবিতা মানুষের মনকে নাড়া দেয় ও প্রশান্তি আনে, কবি ও পাঠকের; তা ধৈর্য ও জীবনে বাঁচার অনুপ্রেরণা ও শক্তি জোগায়। ভগ্ন-হৃদয় এ মলম লাগায়। মৌলিক কর্মকাণ্ডে প্রেরণা জুগিয়ে চলে এই কবিতা। সুতরাং, কবিতার গুরুত্ব অপরিহার্য। তবুও, কবিদের অনেকাংশে (অনেক ক্ষেত্রে) আর্থিক অসচ্ছতা (সংকট) –এর মধ্যে সাংসারিক জীবন যাপন করতে হয়, হচ্ছে। অমোঘ সত্যটি হল – কবিতা তথা সাহিত্য হল মানুষের মনের খোরাক (খোরপোষ)। তাই, কবিতাচর্চা তথা সাহিত্যচর্চা ভালো ও গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যের স্থান নেয়। উল্লেখ্য, প্রচিলিত আছে –কবি, লেখকরা জাতির বিবেক। যদিও বর্তমান টাকার দুনিয়ায় প্রকাশ্য বা নিরবে যেন যথাযথ মূল্য দিতে চায়না লোভী মানুষ। অথচ, যথার্থ কবিতা যুগ যুগ ধরে কবিকে, সভ্যতাকে, ঐতিহ্যকে, স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখে চলেছে। জানতে হবে, কবিতাচর্চা ও কবিতা রচনা এক জিনিস নয়। কবিতা রচনার জন্য কবিতাচর্চা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু কবিতাচর্চা করলেই তা কবিতা (রচনা) নাও হতে পারে। ফেসবুকে কবিতাচর্চা স্বাভাবিক বিষয়। ভালো কাজ সব সময় সব মাধ্যমেই ভালো। নয় কি? আসলে কবিতাচর্চার অর্থ তো কবিতা রচনার প্রাক প্রস্তুতি, প্রাকটিস, খসড়া, পরিকল্পনা, হাতেখড়ি ইত্যাদি বলা ভালো। এই ফেসবুক থেকে অনেকে কবিতাচর্চা ও রচনায় অনুপ্রাণিত হয়ে পত্র-পত্রিকায় স্থান করে নিয়েছেন। ফেসবুক তাঁদের কাছে বীজতলা, আর পত্রিকা – মূল আবাদি খেত। কলকাতায় এক অণুগল্প প্রতিযোগিতার মহাশ্বেতাদেবী স্মৃতি পুরষ্কার-২০১৭ গ্রহণ করতে গিয়ে এমনি অভিজ্ঞতা হয়েছে উপস্থিত কবি, সাহিত্যিক ও অংশগ্রহণকারীদের তথা ব্যক্তিদের মন্তব্য শুনে। ফেবুতে স্বঘোষিত কবি কিংবা ব্যক্তি বা ব্যবহারকারী কবিতা পোস্ট করেন বা কবিতা আকারে কিছু বক্তব্য বা লেখা বা মতামত শেয়ার করেন তা তিনি নিজ দায়িত্বেই পোস্ট করেন; এখানে কোনো রকম যাচাই-বাছাই, বাছ-বিচার তথা মনোনয়নের বিষয় বা সুযোগ থাকে না, কয়েকটি অ্যাপ্রুভাল গ্রুপ ব্যতীত। সতরাং, ফেবুতে এই রকম লেখা বা কোনো লেখা (বা কবিতাচর্চা) যে কবিতা (বা রচনার যথার্থ প্রচেষ্টা) তা বিচার্য বিষয় বলা যায়। এখন প্রশ্ন হল – কোনটা কবিতা বা কবিতা আদৌ হল কিনা, বা হল না – তা নির্ণয় করবে বা করবেন কে বা কারা? পাঠক, নাকি কোনো সদস্যমণ্ডলী? বলা যায় –(পাঠানো লেখা) প্রাথমিক ভাবে পত্রিকায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি (বিভাগীয় সম্পাদক) বা সদস্যমণ্ডলী লেখা মনোনয়ন ও নির্বাচন করেন, পরবর্তিতে তার জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা নির্ণয় করে বসেন সম্মানিত পাঠক। ফেবুর ক্ষেত্রে মনোনয়নের প্রয়োজন পড়ে না, গ্রহণযোগ্যতাও বোঝা যায় না সাধারণত লাইক-কমেন্টের বন্যা দেখে। কারণ, কবিতা খুব গভীর বোঝার অনুধাবনের বিষয়; বুঝতে সময় লাগে সাধারণত সাধারণ মানুষের, হাতে সময় কোথায় (!) যে ডেটা খরচ করে চার্জ ফুরিয়ে মনোরঞ্জন বাদ দিয়ে কবিতা পড়বে, গভীরে ঢুকবে? ফেবু একটি ভার্চ্যুয়াল জগৎ। এখানে লাইক বোতাম, কমেন্ট বাক্স ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন ভিন্ন কাজে বা ধারায় ব্যবহার করে থাকেন। অনেক বেশি বেশি লাইক-কমেন্টের আশায় বাঁকাপথ অনুসরণ করা হয় বলেও জানা যায়। অনেকে না বুঝেই লাইক-কমেন্ট করে থাকে(ন), সামনে যা আসে সে হিসেবে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে আমার পছন্দমতো ভালো-মন্দ দুইই লাইক দিই, আমার লিস্টে থাকা বন্ধুদের দেখানোর প্রয়োজনিয়তা (বোধ করে) অনুসারে। যেমন- ধরুন বাবরী মসজিদ ধ্বংসের দৃশ্য বা ছবি (বা তেমন কোনো লেখা) এফবিতে লাইক দিলাম, তার অর্থ এই নয় যে আমি বাবরী মসজিদ ধ্বংস পছন্দ করছি, বরং বিষয়টি অন্যদের (বেশি বেশি) নজরে আনতে লাইক (বুড়ো আঙুল) দিলাম (যখন কমেন্ট আমার কাছে অসুবিধাজনক)। আবার ভালো লেখা বা ছবিতেও অনেক সময় লাইক দিইনা, পাছে বন্ধুদের নিউজ ফিডে বা নোটিফিকেশনে অযথা আমার লাইক-কমেন্টের ফিডে ভোরে যায় (বন্যা বয়ে চলে) এবং বিব্রত বোধ করে বসেন। (বেশি)পরিচিত-অপরিচিত হিসেবেও লাইক-কমেন্ট বহন করে। আসলে, Like-পছন্দ, আবার বুড়ো আঙুলটি বিপরীতও (অপছন্দ বা কাঁচকলা) বোঝায়।
সুতরাং, ফেসবুকে কবিতাচর্চা করুন– ভালো কথা। কিন্তু, নিজ কবিতা যাচাই করতে মানসম্মত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তা প্রকাশের প্রচেষ্টা চালান। তবেই কবিতা মানসম্মত হবে আশা করা যায়। মনে রাখবেন – ছাপা পত্রিকা ও বইয়ের কোনো (যথাযথ) বিকল্প নেই, হতে পারে না।। 

Saturday, 9 December 2017

বস-২ সিনেমার একটি সংলাপ প্রসঙ্গে আমার মতামত

জীৎ-শুভশ্রী অভিনিত ‘বস২’ বাংলা সিনেমার একটি গানের দৃশ্য নিয়ে ইতিমধ্যে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল।

সমস্যা দেখাদিয়েছিল গানের লিরিক্স বা কথার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ খোলামেলা কস্টিউমে মহিলাদের নৃত্য নিয়ে। শেষ পর্যন্ত ‘বস২’ মুক্তি পেল এবং বর্তমানে প্রেক্ষাগৃহগুলিতে প্রদর্শিত হচ্ছে। তবে সিনেমাটির একটি সংলাপ দর্শকের কাছে ভুল বার্তা বহন করতে পারে বলে মনে হচ্ছে। ‘বস২’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ব চরিত্র – আয়েশা। সিনেমায় আয়েশা তাঁর পিতা শাহনোয়াজ হোসেনকে বন্দুক তাক করে বলেন, আল্লাহ্ নাকি তাঁকে তাঁর মায়ের (হত্যার) প্রতিশোধ নেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন, এবং আয়েশা তাঁর পিতাকে গুলি করে হত্যা করেন (প্রতিশোধ নেন)। প্রসঙ্গত, আল্লাহ্তায়ালা বলেন, ‘অন্যায়ের প্রাপ্য শুধু সম-পরিমাণ অন্যায়। তবে যে ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয় এবং সমঝোতা করে সে আল্লাহর নিকট পুরস্কার প্রাপ্ত হবে। তিনি তো অত্যাচারীদেরকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা শূরা, আয়াত: ৪০) অর্থাৎ, যদিও সম-পরিমাণ প্রতিশোধ নেওয়া জায়েয, তবুও ধৈর্য ধারণ করা উত্তম। মাথায় রাখা উচিত, এখানে ‘সম-পরিমাণ’ কথা বলা আছে। অর্থাৎ, বেশিতো নয়ই, কমও নয়। ধরুন, যদি কেউ আমাকে চার ঘা মারে, আমি তাকে দুই ঘাও মারব – এটা সম-পরিমাণ প্রতিশোধ হতে পারে কি? পারে না। আবার, চার ঘা-এর পরিবর্তে চার ঘা – তাও কি সম-পরিমাণ হবে? কিসের মাপকাঠিতে মাপবেন? আপাত দৃষ্টিতে সম-পরিমাণ মনে হলেও দুপক্ষের চার চার ঘা-এর ভার, বল, শক্তি কোন মাপকাঠিতে সমান হবে? আবার প্রথম ব্যক্তির মারা চার ঘা-এর ব্যাথা, কষ্ট, যন্ত্রণা, মন-মানসিক চাপ কিভাবে সম-পরিমাণ রিটার্ণ (ফেরত) দেবেন বা দেওয়া যাবে। তেমন মাপকাঠি কোথায়? এক্ষেত্রে মানুষের পক্ষে এমন সূক্ষ পরিমাণ নির্ণয় – কি আদৌ সম্ভব? সিনেমায়, স্বামী (শাহনোয়াজ) তাঁর স্ত্রীকে গুলিবিদ্ধ করে খুন করেন, প্রতিশোধে মেয়ে (আয়েশা) তাঁর পিতাকে (শাহনোয়াজ) গুলিবিদ্ধ করে খুন করেন। - এই দুটি ঘটনা কি সমান মনে হচ্ছে? তাছাড়া মৃত্যুর সময় স্ত্রীর (আয়েশার মা) যা কষ্ট হয়েছে, পিতার (আয়েশার পিতা)ও কি সম-পরিমাণ কষ্ট, যন্ত্রণা হয়েছে; সমান রক্ত ঝরেছে, সময়-কাল-স্থান-পাত্র কি সম ছিল? তবে ধৈর্য ধরাণ করে সুবিচার (বা প্রতিশোধের ভার) আল্লাহর কাছে প্রার্থণা করা উচিত। আর প্রয়োজনে অত্যাচারীদের পৃথিবীতে আইনের হাতে তুলে দিন, নিজে আইন হাতে তুলে নেবেন না। - এটা ইসলাম সমর্থিত। 

Thursday, 29 September 2016

প্রসঙ্গঃ ধর্মাচরণে মুসলিম মহিলাদের অংশগ্রহণ


প্রসঙ্গঃ ধর্মাচরণে মুসলিম মহিলাদের অংশগ্রহণ



পশ্চিমবঙ্গের এক দৈনিকে, সম্প্রতি (১২ ও ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬), ইসলাম-হাদীসের আলোকে ও ইসলামি ইতিহাস থেকে তথ্য সমৃদ্ধ মুহাম্মদ ইসহাক মাদানী-র লেখা ‘ধর্মাচরণে মুসলিম মহিলাদের অংশগ্রহণ’ শিরোনামে মূল্যবান নিবন্ধটি পড়ে এবিষয়ে জেগে ওঠা কিছু জিজ্ঞাসা ও ধারণাগুলি ভাগকরে নেওয়ার জন্য এই কলাম ধরা। নিবন্ধের শুরুতেই আছে, ‘হজ প্রত্যেক মুসলিম পুরুষ ও মহিলার উপর শর্তাধীন ফরজ বা অবশ্য পালনীয়।’ অবশ্যই। এখানে ‘শর্তাধীন’ শব্দটি প্রয়োগের অর্থ হল হজ সবক্ষেত্রে বা সবার জন্য ফরজ নয়। এটাই সত্য। যেমন – পুরুষের ক্ষেত্রে মক্কা পর্যন্ত যাতায়াতের (যাওয়া ও আসার) সহায়-সম্বল (হালাল আর্থিক, দৈহিক, আইনগত, ইত্যাদি সামর্থ্য) থাকতে হবে এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে সহায়-সম্বলের সঙ্গে স্বামী অথবা ‘মোহরাম’ (যার সঙ্গে বিয়ে নিষিদ্ধ বা হারাম) এমন ব্যক্তি সঙ্গে থাকতে হবে। সুতরাং, মহিলাদের হজ পালনের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় অতিরিক্ত আবশ্যিক সামর্থ্য থাকতে হচ্ছে। তাহলে, কোনো মহিলার সহায়-সম্বল আছে কিন্তু স্বামী অথবা ‘মোহরাম’ নেই তাঁর কাছে হজ পালন থেকে বিরত থাকা কি ফরজ হবে না? নিষিদ্ধ হবে নাকি? তেমনি সহায়-সম্বলহীন ব্যক্তির ক্ষেত্রে কোনো ভাবেই হজ পালন করা ইসলামে অসমর্থিত। 

মাদানী সাহেব যথার্থ খাঁটি কথায় লেখেন – ‘মহিলাদের একাকী যে কোনও সফর ইসলামে নিষিদ্ধ।’
 একাকী বলতে বোঝায় – স্বামী অথবা ‘মোহরাম’ ব্যক্তির সঙ্গ ছাড়া অবস্থা। নিবন্ধে উল্লেখ, ‘নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর এমন কোনও নির্দেশ পাওয়া যায় না যাতে পুরুষ ও মহিলার মধ্যে নামায আদায়ে পদ্ধতিগত কোনও পার্থক্য আছে।’ তিনি এও লেখেন, ‘শুধুমাত্র একটি বিষয়ে পার্থক্য এই যে, যদি কোনও মহিলা মহিলাদের ইমামতি করেন তবে তিনি প্রথম সারির মহিলাদের সঙ্গে কাতারের মধ্যস্থলে দাঁড়াবেন।’ অথচ, আমরা আরও জানি (নামায শিক্ষা বইগুলি দৃষ্টান্ত) সতরঢাকা বিষয় ছাড়াও নামাযের বেশকিছু বিষয়ে পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যেমন – তাকবীরে তাহরীমায় দোওয়া কুনুতের সময় আল্লাহু আকবার বলে দুই হাত তোলা কালে পুরুষ কান পর্যন্ত এবং মহিলা কাঁধ পর্যন্ত হাত তুলবে। ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর পুরুষ নাভির নিচে কিন্তু মহিলা বুকের উপরে তাহরীমা বাঁধবে। বসার সময় পুরুষ বাম পা বিছিয়ে ডান পা খাড়া রেখে কিবলা মুখি হয়ে বসবে, সেক্ষেত্রে নারী বা মহিলা দুই পা ডানে রেখে নিতম্বের উপর বসবে। সিজদার সময় দুই হাত বগল হতে আলাদা রাখবে পুরুষ, কিন্তু নারীরা তা যুক্ত রাখবে, এবং পুরুষের পেট উরু হতে পৃথক থকবে কিন্তু নারী যুক্ত রাখবে। এরকমভাবে পুরুষ ও নারীর নামায আদায়ের সময় কাঠামোগত, বাধ্যবাধকতাগত (বা ছাড়) তথা পদ্ধতিগত পার্থক্য লক্ষ্যণীয় (নির্দেশিত)। নামায আদায় (নামায ‘পড়া’ নয়, আদায়)-এর পাঠগত (প্রার্থনাগত) পার্থক্য না থাকতে পারে অথবা নেই, কিন্তু পদ্ধতিগত (ফরজ, উয়াজীব, সুন্নাত, মুস্তাহাব সমূহ) কিছু কিছু পার্থক্য রয়েছে। 



হামিম হোসেন মণ্ডল
দৈনিক কলম, ২২/১০/২০১৬

নিবন্ধকারের কথায়, ‘নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবায়ে কেরাম পরবর্তীদের জন্য দ্বীনের কাজে অনুসরণীয়। নিশ্চয় পুরুষদের করণীয় কাজ এবং মহিলাদের করণীয় কাজ সর্বক্ষেত্রে এক নয় – ফলে পুরুষদের জন্য পুরুষরাই আদর্শ এবং মহিলাদের জন্য মহিলারাই আদর্শ।’ অথচ কোরআন-এ পাই (আল্লাহ্ বলেন), ‘তোমাদের জন্য রাসূলের মধ্যেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ –(সূরা আহযাব, আয়াত : ২১)। এখানে ‘তোমাদের’ বলতে পুরুষ ও নারী নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতিকে বোঝানো ও তাদের উদ্দেশে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, পুরুষ ও নারী সকলের জন্যই নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মধ্যেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ। পুরুষ ও নারী উভয়ের করণীয় কাজের শিক্ষা মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছ থেকে পাওয়া যায়, হতে পারে সেটা রাসূলের বিবি, কন্যা, সাহাবি কিংবা এই জাতিয় কোনো ব্যক্তির মার্ফত বা মাধ্যম তা পেতে হয় শ্রেণি বিশেষে। 


 রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন, ‘সর্বোত্তম বাণী হচ্ছে আল্লাহ্-র কিতাব এবং সর্বোত্তম পথ প্রদর্শন হচ্ছে মুহাম্মদের পথ প্রদর্শন।’ –(মুসলিম)। 
মনে রাখতে হবে, রাসূল (সা.) স্বয়ং আল্লাহ্ দ্বারা নির্বাচিত সমগ্র মানবজাতির (পুরুষ, নারী, ছোট-বড় নির্বিশেষে সবার) পথ প্রদর্শক, মানবতার নেতা, ইসলামের নেতা। মহিলাদের জন্য ভিন্ন বা আলাদা বা অন্য কোনো নেতা কিংবা মহিলা নেতা বা নেত্রী কিংবা পথ প্রদর্শক আছে কি? না, নেই। ‘পুরুষরা জুম্মার খুৎবা শুনে জ্ঞানী হোক আর মহিলারা খুৎবা শ্রবণ থেকে বঞ্চিত থেকে মূর্খ থাকুক – এ রকমটা ইসলাম চায় না। ...’ অবশ্যই! কিন্তু, প্রশ্ন হল – অন্ধকার দূর করতে অন্ধকারকে আলোর কাছে নিয়ে যাওয়া যায় কি? যায় না। বরং, আলোকেই অন্ধকারের কাছে বা দিকে নিয়ে যেতে হয়; তখন-ই অন্ধকার দূর হয়। সুতরাং, জুম্মার বক্তৃতা কিংবা খুৎবার উপদেশ কেবল মসজিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না বরং তা সমাজের প্রতিটা অন্ধকারে, প্রতিটা ঘরের প্রতিটা কোণে সর্বপরি প্রতিটা মানুষের অন্তরে ও মস্তিষ্কে পৌঁছে দিতে হবে; বিশেষত নিজে তা যথাযথ পালন করার (ব্যক্তিত্বের) মধ্য দিয়ে আলো সবদিকে ও সবখানে বহিয়ে নিয়ে যেতে হবে। 

প্রত্যেক মানুষের অন্তরই হচ্ছে তার মন্দির বা মসজিদ, যেখানে ভগবান বা আল্লাহ্-র স্থান; সে মানুষ যেখানেই অবস্থান করুকনা কেন। 
 ‘ঈদের দিন কয়েকজন হাবসী বালক চামড়ার তৈরি ঢাল ও যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে খেলা করেন। আমি (হযরত আয়েশা রা.) আল্লাহ্-র রাসূলকে (খেলা সম্বন্ধে) জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন : তুমি কি এই খেলা দেখতে চাও? আমি (মা আয়েশা) বললাম, জি হ্যাঁ। তখন তিনি আমাকে তার পিছনে দাঁড় করিয়ে দিলেন – এমতাবস্থায় আমার গাল আল্লাহ্ রাসূলের গালের সঙ্গে মিলানো ছিল। ...’ –(বুখারি ও মুসলিম)। 
সুতরাং, মহিলারা খেলা দেখতে কিংবা বিনোদন সারতে পারেন কিন্তু তারও একটি আদব বা নিয়ম রয়েছে; বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমানে, মহিলাদের এমতাবস্থায় খেলা দেখতে দেখা যায় কি? নাকি সংশ্লিষ্ট পুরুষরা (স্বামী) সঙ্গ দেন? নাকি সমাজ এমতাবস্থায় দেখতে অভ্যস্ত? এটাই কিন্তু আদব। আর তা না হলে কীভাবে মহিলারা আনন্দ-উপভোগ করবে? অন্যভাবে তাদের এরকম আনন্দ-উপভোগ করা জায়েজ হবে কি? 
 হযরত উমর তনয় আবদুল্লাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আল্লাহ্-র রাসূল বলেছেন, তোমরা আল্লাহ্-র বান্দিদেরকে আল্লাহ্-র মসজিদসমূহে যেতে বাধা প্রদান করিও না।’ –(বুখারি, মুসলিম, আবূ দাউদ)। 
এখানে ‘রাসূল (সা.) মহিলাদেরকে মসজিদে যেতে বাধা না দিতে পুরুষদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।’ অর্থাৎ, মহিলারা যদি মসজিদে যান পুরুষরা যেন তাদের বাধা না দেন। এখানে একটি ‘যদি’ চলে আসছে। কিন্তু, কোথাও মহিলাদের প্রতি এমন কোনো নির্দেশ দেওয়া আছে কি - যেন তারা মসজিদে যায়? নাকি পুরুষদের বলা হয়েছে স্ত্রী, কন্যাদের মসজিদে পাঠাতে? সুতরাং, মহিলাদের মসজিদে যাওয়া না-যাওয়াটা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক বা ইচ্ছাধীন। কিন্তু, তাদের বাধা না দেওয়াটা পুরুষদের প্রতি নির্দেশ। 

 ‘নবী (সা.) শিশুদের কান্নার জন্য নামায সংক্ষিপ্ত করেছেন কিন্তু ওদেরকে মসজিদে আসতে নিষেধ করেননি।’ কিন্তু, ওদের মসজিদে আসতে নির্দেশ দিয়েছেন কি? এবিষয়ে নিবন্ধের শেষাংশে এসে যথার্থ হাদিসের বাণী উল্লেখ করেছেন মাদানি সাহেব, - ‘আল্লাহ্-র রাসূল বলেছেন, তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের মসজিদে যেতে বাধা দিও না। এবং তাদের গৃহ তাদের জন্য উত্তম।’ –(বুখারি)। একদিকে ‘তিনি (সা.) কর্তাদের মহিলাদেরকে মসজিদে যেতে বাধা দিতে নিষেধ করেছেন,’ অন্যদিকে ‘গৃহে নামায পড়া তাদের জন্য উত্তম’ বলা হয়েছে। - এটাই নিবন্ধটির যথাযথ উপসংহার এবং মূল কথা। তবুও উত্তম কাজ ছেড়ে মহিলারা যদি মসজিদ মুখি হন, তবে শরিয়ত সম্মত সফর সঙ্গ-এর সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে। নিবন্ধে মহিলাদের যামাতে মহিলা ইমামতির কথা জনলাম। পুরুষ ও মহিলা একই যামাতে নামায আদায়ের কথাও জানলাম। হয়তো তখনকার সেই পরিস্থিতিতে উত্তম কাজ করতে না পারার চেয়ে নামায আদায়ের স্বার্থে পুরুষ ও মহিলাদের একই যামাতে অংশ নিতে হয়েছিল গৃহে নামায আদায়ের (প্রাসঙ্গিক) কোনো সমস্যার কারণে। তাই তাদের মসজিদে যেতে বাধা না দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল হয়তো। 

বর্তমান পরিস্থিতি কি তেমন? ইসলাম পরিস্থিতিকে মানিয়ে নিয়ে আদবের সাথে চলার শিক্ষা দেয়। যামাতে গরিব-ধনী, ছোট-বড়, রং-বর্ণ নির্বিশেষে ভেদাভেদহীন ভাবে এক হয়ে একে অপরের কাঁধে কাঁধ রেখে পাশাপাশি দাঁড়ান; যে যেখানে ইচ্ছা দাঁড়াতে পারেন, এখানে কোনো সংরক্ষণ থাকে না। কিন্তু, পুরুষ ও মহিলারা (ইসলামের ইতিহাস মতো) একই যামাতে নামায আদায় করতে দাঁড়ালে মহিলারা পুরুষদের পেছনে দাঁড়তেন নির্দেশ মতো আদব মাফিক। এখানে পুরুষ ও মহিলা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামায আদায়ের অধিকার বা অনুমতি আছে কি? তাদের গৃহে নামায আদায় করা উত্তম, আর এটাই পালন করা উচিৎ। অন্তরে পালন, লালন, বিশ্বাস, মান্য করার বিষয় হল ইসলাম; আর তা প্রকাশ্য হল সৌজন্য, দ্যুতি, ঔজ্বল্য, দ্বীপ্তি; যা নিজেরতো বটেই পারিপার্শিক সব অন্ধকার দূর করে। মূল্যবান নিবন্ধটির জন্য মুহাম্মদ ইসহাক মাদানী সাহেবকে শুকরিয়া জানাই। 

Sunday, 8 May 2016

গীবত : একটি সামাজিক অপরাধ



কলম-এ দ্বীন দুনিয়া ক্রোড়পত্রের পাতায় ৪ ডিসেম্বর যুগোপযোগী এবং মূল্যবান বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেছেন জনাব আবুল হাসান 'গীবত : একটি সামাজিক অপরাধ' নিবন্ধের মধ্য দিয়ে বাস্তবসম্মতভাবে। তাঁর এই তথ্যপূর্ণ দলিল সম্মলিত আলোকপাতের জন্য বিশেষভাবে তাঁর জন্য দোয়া রইল। লেখাটি প্রকাশের জন্য কলম, পাঠক ও গীবত থেকে বাঁচাতে সদিচ্ছুকদের জন্যও রইল দোয়া। সর্বপরি সুপথ অবলম্বনে সচেষ্ট সকলের জন্যই দোয়া রইল।
আমার মতে, কারো দোষত্রুটি, ভুলত্রুটি অন্যের কানে তোলা বা পৌঁছে দেওয়াই হল 'গীবত''গীবত' বা 'পরচর্চা'। তাঁর উপস্থিতিতেও (তাঁর বিনা অনুমতিতে) অন্যের কাছে তাঁর দোষত্রুটি বা ভুলত্রুটি তুলেধরাও কিন্তু অন্যায়, অপরাধ। পবিত্র কুরআনের সতর্ক বাণী, 'তোমরা অন্যের দোষ খুঁজে বেড়াবে না।' (সূরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)
উল্লেখ্য, হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা দিয়েছেন, হযরত মুহাম্মাদ সা. বলেছেন : 'তোমরা কি জানো গীবত কাকে বলে?' সাহাবীরা বললেন : 'আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল সা. ভালোই জানেন।' উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ সা. বললেন : 'তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে - সেটাই গীবত।' - যথার্থ।
    কারো দোষত্রুটি বা ভুলত্রুটি দেখলে তা দ্বিতীয় ব্যক্তি বা অন্য কারো কানে না-তুলে, অপরাধ তথা পাপের পাল্লা ভারী না-করে, প্রয়োজনে তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে গোপনে তাঁর সমর্থন আদায়ের মধ্য দিয়ে সুসঙ্গতভাবে সংশোধন যোগ্য হলে তাঁর দোষত্রুটি বা ভুলত্রুটি সংশোধনে সাহায্য করা প্রয়োজন; কিন্তু কোনভাবেই পিড়াপিড়ি, সম্মানহানী, বিতশ্রদ্ধা বা মনমালিন্য করা অনুচিত।
লেখক উল্লেখ করেছেন গীবত থেকে বাঁচার যথার্থ তিনটি উপায়ের কথা। সবচেয়ে কার্যকারী ও গীবত এড়ানোর বাস্তব উপায় হল - বাক্ সংযম অবলম্বন করা। এই প্রসঙ্গে যথার্থ বলেছেন :
  'যত কথা কম বলা যায় তত বেশি গীবত থেকে বাঁচা যাবে। অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। চুপ থাকা ইবাদাতও বটে। একবার আল্লাহর রাসূল সা. বলেছিলেন, 'হে আবু যর! আমি কি তোমাকে এমন একটা গুনের কথা বলব না, যা বহন করতে হালকা কিন্তু মীযানের পাল্লায় খুব ভারী?' হযরত আবু যর রা. বললেন, 'হ্যাঁ।' রাসূলুল্লাহ্ সা. বললেন, 'দীর্ঘ সময় ধরে নীরব থাকা ও উত্তম ব্যবহার।' (মিশকাত)।'
কিন্তু প্রয়োজন সাপেক্ষে কথা বলে উচিৎ, চুপ থাকা নয়। প্রয়োজনীয় কথা সাধারণত ও প্রধানত কম বা অল্প-ই হয়ে থাকে।
কম কথা, উচিৎ কথা, কথার সেরা কথা। কথায় আছে - বোবার শত্রু নাই। আসলে কাজের কথা অল্প হয়। আর 'পরচর্চা' বাদে (ছাড়া) কোনো কথাই দীর্ঘ হয়না। আর বর্তমানে 'পরচর্চা'র আরৎ হচ্ছে রাস্তা লাগোয়া চা-এর (চায়ের) দোকানগুলি।
পূর্ণ জ্ঞান হলে মানুষ চুপ হয়ে যায় :
লোকশিক্ষক পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণ দেব বিদ্যার সাগর ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, 'ব্রহ্ম অনুচ্ছিষ্ট''পূর্ণ জ্ঞান হলে মানুষ চুপ হয়ে যায়। বিচার করা যতক্ষণ না শেষ হয়, লোকে ফড় ফড় করে তর্ক করে, শেষ হলে চুপ হয়ে যায়। কলসি পূর্ণ হলে আর শব্দ হয় না। যতক্ষণ না কলসি পূর্ণ হয় ততক্ষণ শব্দ।'
আবার দেখবেন জ্ঞানী মানুষেরা কম কথাই বলেন। যেমন ধরুন আমরা যদি বলি - ঘোড়ার ডাক; জ্ঞানী বলবেন - হ্রেষা। হলনা কম কথা! একটা অংক কোনো বিজ্ঞ মনেমনে কষে নিমেশেই একটা শব্দে বা বাক্যে উত্তর বলে দিতে পারেন; কিন্তু আমাদের কাছে ওই অংকের সমাধান করতে বেশ কিছু সময় নিয়ে কষে একটা সাদাপাতা ফুরিয়ে যাবে! তাইতো বলে ফাঁকা কলসি বাজে বেশি। আর যে সৃষ্টি সম্পর্কে ভাবে, সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য খোঁজে, সৎ ও সত্য সন্ধানী, সারাক্ষণ নিজের অস্তিত্ব খোঁজে, বোঝে অন্যের দুঃখ-কষ্ট, মানে নিয়তি, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, আত্মসমালোচক, আত্মসম্মাণবোধ আছে সে আরও চুপ হয়ে যায়। কারণ, দোষারোপ করার কোনো জায়গা নেই, নিষ্ঠুর দুনিয়াতে কর্মই ধর্ম, দ্বীন দুনিয়া-তে কেউ কারো নয়, সব একলা, কেবলমাত্র এক আল্লাহ্-ই ভরসা (যিনি সর্বদা সর্বত্র বিরাজমান, তাঁর সঙ্গে সঙ্গোপনে স্বচ্ছ অন্তরে ও চোখের পানিতে কথা বলা যায়।), নিরতি বা বিধাতার লিখন কেউ খণ্ডন করতে পারেনা, নিষ্ঠুর বাস্তব ও বাস্তবের নির্মমতাও অবোধ বালকের মতো মেনে নিতে হয়, সব সময় নিজের দোষত্রুটির দিকে দৃষ্টিপাত, নিজের ভুলত্রুটির জন্য আত্মশোচনা, নিজের ব্যর্থতা বা অসামর্থতার প্রতি গভীর অনুশোচনা কথা বলার প্রাসঙ্গিকতা নষ্ট করে দেয়। ইসলাম - জাকজমক, অপচয়, গালাগালি, হিংসা, হাসি-ঠাট্টা-তামাশা, ঠকানো, দোষারোপ করা, গীবদ-কে বিন্দুমাত্র পশ্রয় দেয়না।
  সুতরাং, এতো আনন্দ ও (দীর্ঘ)কথা কীসের?

Saturday, 7 May 2016

রাখালের বাঁশি আর বাজে না, তবে ছাত্রের গিটার বাজে



রাখালের বাঁশি আর বাজে না,
তবে ছাত্রের গিটার বাজে

দৈনিক কলম পত্রিকায় অভিমত বিভাগে ০৭ মে ২০১৬ এ প্রকাশিত

কলম-এ ৩০ এপ্রিল মুন্সি দরূদ  মুহাম্মদ ওয়েছের অভিমতটি নস্টালজিক। 'রাখালের বাঁশি আর বাজে না'না বাজলে কি হবে? ছাত্রের গিটার এখন বাজছে। উন্নতি হয়েছে! রাখালরা একসময় অক্লান্ত পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করত, গরু-াগল-মোষ চরাত, গরু-লাঙল দিয়ে চাষের জমি কর্ষণ করত, গরুর গাড়ি চালাত। এরই ফাঁকে বিনোদন সারত বা বিরক্তি এড়াতে গুনগুন সুরে গান গাইত ও বাঁশি বাজাত।
কিন্তু এখন বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে চাষের জমি কর্ষণ করছে ট্রাক্টর ফসল কাটা, মাড়া, পেষা ও বহন করার জন্য পরিষেবায় রয়েছে বিভিন্ন রকম মেশিন। সুতরাং মানুষের খাটুনি কমেছে, সুবিধা বেড়েছে। তাই রাখাল বালকের প্রয়োজনীয়তা লোপ পেয়েছে। তাদের আর কড়া রোদে পুড়ে অঝোর বৃষ্টিতে ভিজে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয় না। এরা আজ বেশি উপার্জনের জন্য অন্য রাজ্যে বা বিদেশে কাজ করতে চলে যাচ্ছে অনেকেই স্কুলমুখী হচ্ছে। ফলে গ্রামগঞ্জে কিছুটা হলেও শ্রমিকের অভাব দেখা দিচ্ছে এবং মজুরি বেড়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে সুবিধা হয়েছে অনেক। এটা কি উন্নয়ন নয়? আধুনিক চাষ-আবাদ ছাড়া বিশ্বমানবের মুখে আহার উঠবে না।
পত্রের শেষে দরূদ সাহেবের অভিমত, 'চাষাবাদেও একপ্রকার অনীহা দেখা দিয়েছে জমির মালিকদের।'
তাই ভাবতে হয়, উন্নয়ন আসলে কী? প্রকৃত উন্নয়ন কীভাবে হয়?


হামিম হোসেন মণ্ডল (বুলবুল)
ঝাউবনা, নওদা, মুর্শিদাবাদ

Wednesday, 4 May 2016

নারীর ক্ষমতায়ন কি কর্মসংস্থানেই অর্থবহ হয়?



প্রসঙ্গ : কর্মসংস্থান জরুরি, না হলে নারীর ক্ষমতায়ন অর্থবহ হবে না

কলম-এ ১৮ এপ্রিল ২০১৬ প্রকাশিত আজিজুল হক সাহেবের লেখা ‘কর্মসংস্থান জরুরি, না হলে নারীর ক্ষমতায়ন অর্থবহ হবে না’ অভিমতের পরিপ্রেক্ষিতে এই পত্রের অবতারণা।
         অভিমতে হক সাহেব লেখেন, ‘আন্তর্জাতিক নারীদিবসে প্রতি বছর মেয়েদের সম্পর্কে বিভিন্ন আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। কিন্তু পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায় তা বাস্তবায়িত হয় না।’ এখন, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একজন নারী (ইন্দিরা গান্ধি), রাষ্টপতি ছিলেন একজন নারী (প্রতীভা প্যাটিল), যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একজন মেয়ে (মমতা ব্যানার্জী); এমএলএ, এমপি, মন্ত্রীও মহিলা হন; আইপিএস, অফিসার, সেনাবাহিনীতে মহিলা; যেখানে নারী-পুরুষ সকলেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, ভোটে দাঁড়ান, রাস্তা জুড়ে মিছিলে হাঁটেন; চাকরিসহ সবক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত; বরং, কিছু কিছু স্থানে লেডিস ফাস্ট প্রথা চালু আছে। সেখানে ‘পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থা’ কথাটি কতটা যুক্তিযুক্ত(?) তা ভাবার বিষয়। ভাবুন, মেয়েরা ছেলেদের মতো কেন চলাফেরা ও মেলামেশা করতে পারে না? যেখানে মাতা একজন মেয়ে বা নারী, সেখানে পিতা একজন ছেলে বা পুরুষ হলে দোষের কি? এটাই ত প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট!
         হক সাহেব লেখেন, ‘সৃষ্টি রহস্য ও গতিশীলতা নির্ভর করে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রক্রিয়া বৈবাহিক বন্ধনের ওপর। তবে আর্থিক প্রগতি ছাড়া মেয়েদের জীবন অসম্পূর্ণ।’ প্রসঙ্গত, আর্থিক প্রগতি ছাড়া প্রতিটি মানুষেরই (স্ত্রী, পুরুষ) জীবন অসম্পূর্ণ। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন, বিবাহ উপযুক্ত মেয়েকে (পাত্রিকে) পাত্রস্থ করার জন্য পাত্রি ও পাত্রির অভিভাবকগণ ছেলের (পাত্রের) আর্থিক প্রগতির দিকটা সর্বপ্রথম আবশ্যিকভাবে দেখেন; অপরপক্ষে, পাত্র ও পাত্রের পরিবার পাত্রির (মেয়েটির) আর্থিক প্রগতির বিষয়টি দেখার প্রয়োজনবোধ করেন না। বলাবাহুল্য, ছেলেটির আর্থিক প্রগতি থকতেই হবে; কিন্তু, মেয়েদের ক্ষেত্রে এটা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক। কারণ, ইসলামের দৃষ্টিতে, পরিবারের ভরণ-পোষণের (আর্থিকভাবে) গুরুদায়িত্ব ছেলেদের (পিতা, স্বামী, ইত্যাদি) হাতে দেওয়া রয়েছে, মেয়েদের (স্ত্রী, কন্যা, ইত্যাদি) হাতে নয়।
         তিনি বলেন, ‘পাশ্চাত্যে মেয়েদের জীবনশৈলি প্রাচ্যের তুলনায় আলাদা।’ – এটাই প্রাচ্যের ঐতিহ্য।
         তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশের মেয়েরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে পিছিয়ে আছে।’ বরং, তুলনামূলকভাবে (পরিসংখ্যানের নিরিখে) ছেলেরা যথাযথ শিক্ষা (সামগ্রিকভাবে) ও কর্মসংস্থানে (চাকরিগত) পিছিয়ে আছে। গ্রামে একটু বড় হতেই (কিশোর/যুবক) ছেলেরা ভিনরাজ্যে পাড়ি জমায় রোজগারের সন্ধানে, তখন মেয়েরা স্কুল-কলেজে পড়াশোনা সারে এবং বড়ভাই বা পিতা ভিনরাজ্য বা বিদেশ থেকে অর্থ পাঠান। বলাবাহুল্য, মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের সংখ্যা বেশি সমাজে।
         হক সাহেব সমব্যথির সুরে লেখেন, ‘বিবাহিত জীবনে মেয়েদের গর্ভধারণ, সন্তান প্রতিপালন এবং সংসারের যাবতীয় কাজ করতে হয়।’ তবে, এর জন্য কি স্বামী পারিশ্রমিক দেবেন? নাকি সরকার ‘গৃহিনীশ্রী’ প্রকল্প করবে? তারচেয়ে বরং, সম্পর্ক ও অবস্থান অনুযায়ী হৃদয় অনুভূতি দিয়ে ভালোবাসা দিলে এবং যথাযথ যত্ন নিলেই মেয়েদের কাছে উপযুক্ত ও যথাযথ পারিশ্রমিক দেওয়া হবে বলে মনেকরি। ‘কৃষিজীবি পরিবারের মেয়েরা রান্নাবান্ন ছাড়াও গরুর খড়কাটা থেকে শুরু করে গবাদি পশুর খাওয়ার জল এবং পরিবারের স্নানের জল পর্যন্ত সংগ্রহ করে। গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে অনেকে অবহিত নন বলে মেয়েদের জীবনযন্ত্রণা তাঁরা জানেন না বা জেনেও এড়িয়ে যান।’ এছাড়াও অনেক গ্রামীণ পরিবারে মেয়েরা পরিবারের পানের জল সংগ্রহ, গম-ধান মিল থেকে পিষে-ভেনে আনা, ইত্যাদি কাজও করে থাকেন। মিল থেকে গম পিষে আনার কাজ অতিরিক্ত হলেও বরং তা মেয়েরা ভালোবাসার তাগিদে ও পরিবারের স্বার্থেই করে থাকেন; অনেক সময় বাধ্য হয়ে...অবহেলিত বা নির্যাতিত বলে তাদের ভালোবাসাকে ছোট না করে (বা তাদেকে অতিরিক্ত কাজে বাধ্য না করে) তাদের কিছু কিছু কাজ ছেলেরা ভাগ করে নিলে বা কাজে হাত লাগিয়ে সহযোগিতা করলে সমস্যার সমাধান হয়। প্রসঙ্গত, এই পরিবারের পুরুষদের বা ছেলেদের যথাযথ কর্মসংস্থান বা আর্থিক প্রগতি হলে পরিবারটির (ছেলে, মেয়েদের) জীবনধারা পালটে যাবে। সেক্ষেত্রে, কেবলমাত্র মেয়েদের আর্থিক প্রগতি হলে পরিবারটির জীবনধারা দৃষ্টিকটু দেখাবে, নাকি? কতজন মেয়ে কষ্টকরে বাইরের কাজ করতে ইচ্ছুক? অন্যদিকে, হক সাহেব, একই পরিবারে ছেলেদের কাজের দিকে দৃষ্টিপাত করাননি। ছেলেরা কি সারাদিন বাড়িতে ঘুমান; নাকি টিভি, সিরিয়াল দেখে দিনের একাংশ বা অধিকাংশ বিনোদনে কাটান? নাকি, শিক্ষক হয়ে স্কুলে ফাঁকি দেন?
         তিনি আরও লেখেন, ‘আমাদের দেশে দরিদ্র পরিবারের কিছু মেয়ে বিএ, এমএ পাশ করেও চাকরি না পেয়ে হতাশার মধ্যে জীবনযাপন করছে।’ কিন্তু, কেন? তারা ত যখন তখন ডাক্তার, মাষ্টার, চাকরিজীবি ছেলেকে বিয়ে করে রাতারাতি বড়লোক বা ধনী হয়ে যেতে পারেন। বিয়ের পরে ভারি স্বামীর দাপটে চাকরিও জুটে যায়। অথচ, আমাদের রাজ্যে তথা দেশে দরিদ্র পরিবারের বেশ কিছু ছেলে বিএ, এমএ, বিসিএ, এমবিএ, বিটেক পাশ করেও চাকরি ছাড়া হতাশ জীবনযাপন করছেন। এদের কি উচ্চশিক্ষিতা, চাকরিজীবি মেয়ে স্ত্রীরূপে কিংবা ধনী শশুর জুটবে? মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের আর্থিক প্রগতি আগে দরকার, যা আবশ্যিও বটে
হামিম হোসেন মণ্ডল, ঝাউবনা, নওদা, মুর্শিদাবাদ