Followers

Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts

Thursday, 11 January 2018

ধূমপান বিষপান

ধূমপান বিষপান
হামিম হোসেন মণ্ডল (বুলবুল)



          মানুষের এক সহজাত প্রবৃত্তি বা স্বভাব হল খারাপ জিনিসের প্রতি আসক্তি। সেই থেকে শুরু নেশাদ্রব্য গ্রহণ। আর নেশা জগতে অতিপরিচিত ও অতিসহজলভ্য নাম ধূমপান। ধূমপান শরীরের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকারক। ধূমপান যে স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক সেকথা সিগারেটের প্যাকেটও জানান দেয়। মরণব্যাধি ফুসফুসে ক্যান্সারসহ শাস-প্রশ্বাস নালীর কঠিন ও জটিল অসুস্থতাসহ উচ্চ রক্তচাপের মতো কষ্টকর সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে কার্যত অবাঞ্ছিত ভাবে ধূমপায়ীদের আয়ু অনেকাংশে কমে যায়। আয়ু কমে যাওয়ার তুলনায় আক্রান্ত জটিল ব্যাধির পিড়া আরও ভয়ানক। সক্রিয় ভাবে ধূমপানে অংশগ্রহণ না করেও সক্রিয় ধূমপায়ীদের সিগারেট ও মুখ থেকে নির্গত নিষাক্ত ধোঁয়ার প্রভাবে পরোক্ষ ধূমপায়ী হয়ে শাসকষ্ট, শাসনালীতে প্রদাহ ও ফুসফুসে নানান কঠিন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
          আমেরিকার প্রধান স্বাস্থ্য উপদেষ্টা তথা সার্জেন ডাক্তার রেগিনা বেনজামিন বলেন, সিগারেট, বিড়িতে টান দেওয়া মাত্রই শরীরের কেষগুলির উপর ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া সংগঠিত হতে থাকে। যার ধারাবাহিকতার জেরে মরণরোগ ক্যান্সার দেখা দেয়। ধমনি রুদ্ধ হয়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এভাবে দুনিয়াবাসীকে সতর্ক বার্তা দিয়ে তিনি আবারও জানান, প্রতিটি সুখটানেই (নিশ্চিত) শত শত বিষ রাসায়নিক পদার্থ ঢোকে শরীরে। ধূমপান বাহিত এইসব বিষ সুখটানের সঙ্গে সঙ্গেই রক্ত টেনে নেয় এবং বিষ সমস্ত দেহযন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে সিগারেটের সৌজন্যে বিষ পদার্থ নিকোটিন অতি দ্রুত আত্মসাৎ করায়। রক্তের মধ্যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে, ফলে রক্ত আঠালো হয়ে জমাট বাঁধতে থাকে। ইতিমধ্যে সংকুচিত হয়ে থাকা ধমনি রক্ত জমাট বাঁধার কারণে অবরুদ্ধ হয়ে হার্ট অ্যাটাক হয় কিছু বুঝে ওঠার আগে। অনেকে ভাবেন বিড়ি বা সিগারেট টেনে এখনও তো খুব ভালো আছি, এটা আসলে ভুল ধারণা। আন্যদিকে কিন্তু প্রায় অধিকাংশ মানুষ (ধূমপায়ী ও অধূমপায়ী) জানেন বা মনে করেন ধূমপান আসলে বিষপান। তবুও কিন্তু এদের মধ্যে অনেকেই ধূমপান করে থাকেন। কিন্তু কেন? জাগে প্রশ্ন। এটাই তো আসক্তি, ঝোক, Addiction এর ফল, অর্থাৎ নেশা।
মানুষ নেশা করে কেন? আসলে কারা নেশা গ্রহন করে? তারা নেশাগ্রস্ত বা আসক্ত হয়ে পড়ে কখন? হতেপারে কোনো দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত, হতাশ, অসুস্থ, বেগার বা বেকার কিংবা লোভি ভোগবিলাশিতার কারণজানেন, লোভ কখনও চাহিদা পুরণ করতে দেয় না। ব্যক্তি জীবনে হতাশা, ব্যর্থতা, দুঃখ-কষ্ট, মানসিক যন্ত্রণা কম-বেশি লেগে থাকবেই; কিন্তু, সেগুলো যখন সীমা অতিক্রমণ করে চরমে পৌঁছোয়, যেখান থেকে সুস্থ সমাধানের মাধ্যমে শান্তি দূর-আশা তখনই অলীক সুখের মরীচিকা নিয়ে নেশার প্রাদুর্ভাব ঘটেহয়তো ব্যর্থতা, দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণার উৎস ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা নিষ্ঠুর সামাজিক কিংবা অসামাজিক, অক্ষমতা, অবাঞ্ছিত কোনো অঘটনার ফল, চিন্তাগত বা অন্যকিছু। অথবা, মৌলিক, সামাজিক, ন্যায্য কোনো অধিকার থেকে বঞ্চনার শিকার অথবা অর্থনৈতিক অবক্ষয় যা নেশা গ্রহণ ও আসক্তির উল্লেখযোগ্য কারণ হতে পরে।
যাইহোক, দৈনিক ইনকিলাব (১৩-৪-২০১৬) সূত্রে, যারা ভাবছেন একবারই নাহয় ধূমপান করলাম তাদের উদ্যেশে ডাক্তার বেনজামিনের হুঁশিয়ারি, ওই একটি সিগারেটের বিপদ সম্পর্কে ৭০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে দাখিল করেছেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ওবামা নিশুক্ত এই সার্জেন জেনারেল। রিপোর্টে উল্লেখ, পুয়েবলো, কলোরাতোতে নিষিদ্ধ হয় ২০০৩সালে। ঠিক তার ৩বছর পরে দেখা যায় হার্টের অসুস্থতার কারণে ৪১শতাংশ কমেছে রোগী ভর্তির সংখ্যা, হাসপাতালে। রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পর নিকোটিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কে মাইকেল কামিংস মন্তব্য করেন, ধূমপান তথা তামাকজাত যে কোনও নোশাই অবিলম্বে নিষিদ্ধ হওয়া উচিৎ। দেশের যত মানুষ হাসপাতালে সিকিৎসাধিন তার এক তৃতীয়াংশ ধূমপানজনিত ব্যাধির কবলে। রিপোর্টে উল্লেখ, গত বছর (২০১৫) আমেরিকায় যত লোক মারা যান তার মধ্যে প্রতি ৫জনে একজনের মৃত্যুর কারণ ধূমপানজনিত রোগ। আরও উল্লেখ, তামাকের ধোঁয়া সাত হাজারেরও বেশি রাসায়নিক এবং যৌগ ক্যানসার সৃষ্টিকারীসিগারেটের চেয়ে বিড়িতে কার্বন মনোক্সাইড এবং অন্যান্য বিষ যৌগ বেশি মাত্রায় থাকে। তাই বিড়ি বা সিগারেট ফুঁকেই মৃত্যুর হার বেশি।
বাংলাদেশে ৪৩শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক তামাকদ্রব্য ব্যবহার করেন। ফলে, যক্ষ্মা রোগে মৃত্যুর হারের নিরিখে বিশ্বে ষষ্ঠস্থান দখল করে দেশটি, যে রোগে দেশটিতে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে।
ধূমপান মাদকদ্রব্যের তুলনায় বেশি ক্ষতিকর। ধূমপানে কেবল ধূমপায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়না, বরং ধূমপায়ীদের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধবরা অর্থাৎ অধূমপায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
সিগারেটের উপাদান সমূহ।
তামাকের শুকনো পাতাকে গুড়ো করে তমাল, টেন্ডুপাতা এবং পাতলা কাগজে মুড়িয়ে বিড়ি, চুরুট বা সিগারেট প্রস্তুত করা হয়। এগুলো প্রজ্জ্বলিত করে বিভিন্ন প্রণালীতে শ্বাসনালী ও মুখগহ্বরে তামাকের ধোঁয়া প্রবেশ করানোর (বদ)অভ্যাস হল ধূমপান।
জাতিসংঘ রেডিও সূত্রে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-এর মতে, ২০৩০ সাল নাগাদ ধূমপানজনিত কারণে বার্ষিক মৃত্যুর হার আশি লাখে পৌঁছতে পারে। তামাকের উপর কর বাড়ানোর জন্য এবছর সংস্থা বিশ্বের সব রাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্বব্যাপী সিগারেটের উপর পঞ্চাশ শতাংশ হারে কর বৃদ্ধি করা হলে ধূমপায়ীর সংখ্যা কমবে প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ এবং ১ কোটি ১০ লাখ জীবন বাঁচবে। ধূমপান এতো মারাত্মক ক্ষতিকারক তবুও কেন তা তথা তামাকদ্রব্য একেবারে নিষিদ্ধ করা যাচ্ছে না?
তথ্য বলছে, পৃথিবীতে প্রায় ১ বিলিয়নের অধিক মানুষ ধূমপান করেন। পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক শিশু বিষাক্ত নিকোটিনযুক্ত দুষিত বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে। পৃথিবীর শতকরা ৮০ভাগ ধূমপায়ী নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের বাসিন্দা। প্রতি ৬ সেকেণ্ডে ১টি মৃত্যুর জন্য ধূমপান কোনো না কোনো ভাবে দায়ী। বয়স্ক ১০টি মৃত্যুর ১টির সঙ্গে ধূমপানের সম্পৃক্ততা পারমাণিত।
নাইটসেড গোত্রভুক্ত একটি হার্ব হল তামাক, যা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকা, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল ভ্রমণ করে বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চাষাবাদের উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সাধারণত তামাক ও তামাকজাতদ্রব্য গুলোকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। একটি- ধূমপানমুক্ত অর্থাৎ চিবিয়ে খেতে (সেবন) হয় বা নস্যি হিসেবে ব্যবহৃত তামাকষ অপরটি- ধোঁয়াযুক্ত অর্থাৎ ধূমপান, যেমন- বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা, শিশা, পাইপ, ইত্যাদি।
এখনো অবধি সিগারেটে তথা তামাক পাতায় ১৯টি ক্যান্সারের উপাদান আবিষ্কৃত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে নিকোটিন, পলিনিউক্লিয়ার এ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন, এ্যাক্রোলিন, নাইট্রোসেমাইন, সায়ানাইড, তেজক্রিয় কারসিনোজেন যেমন- লিড-২১০, প্লামবাম-২১০, পলনিয়াম-২১০, রেডিয়াম-২২৬, রেডন-২২২ এবং বিসমাথ-২১০, ফর্মালডিহাইড, ইত্যাদি। নিকোটিন ব্যবহৃত হয় কিটনাশক প্রস্তুতে।
সামগ্রিকভাবে সিগারেটের মধ্যে ৬০০ রকমের ক্ষতিকর উপাদান উপস্থতির সম্ভাবনা রয়েছে। যার ধোঁয়া থেকে প্রায় ৭ হাজার ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক উৎপন্ন হয়। প্রসঙ্গত, মাউন্টসিনাই স্কুল অব মেডিকেল ডেইলিকে বলেন, সিগারেটের মধ্যে এমন শত শত উপাদান থাকে যা তামাক গাছের মধ্যে থাকে নাএগুলো যখন পুড়তে থাকে তখন আরো নতুন নতুন রাসায়নিক দ্রব্য উৎপন্ন হয়। এরা স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্ষতি সাধন করে।
ধূমপানের ওপর সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা হল ব্রিটিশ গবেষক রিচার্ড ডল সম্পাদিত। তাতে ৩৪৪৩৯জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, একটি অংশ ধূমপায়ী এবং বাকি অংশ অধূমপায়ীদের নিয়ে গবেষণা করেন ১৯৫১ থেকে ২০০১সাল অবধি। পর্যবেক্ষণে দেখাযায়, ধূমপায়ীরা অধূমপায়ীদের তুলনায় ১০বছর আগে মারা যান, ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্টোকে। তারা দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থেকে মৃত্যুকে পরখ করেন। এছাড়াও ২০০৬সালে মার্চ মাসে স্কটল্যাণ্ডের উন্মুক্ত স্থানে ধূমপান নিষিদ্ধ করার ফলে আগের বছরের হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৭ শতাংশ কমে। এমনকি আধূমপায়ীদের মধ্যে আগের বছরের তুলনায় ৬৭ শতাংশ কমে। সুতরাং, বোঝাযাচ্ছে অধূমপায়ীরাও ধূমপানের শিকার ধূমপায়ীদের সৌজন্যে। আর, ধূমপান আসলে বিষপান।



[ তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট। ]

Sunday, 24 December 2017

মিড ডে মিল, বিদ্যালয় শিক্ষা ব্যবস্থা ও বাস্তবতা

দৈনিক কলম পত্রিকায় ৩০/০৮/২০১৫

মিড-ডে মিল অর্থাত্ দুপুরের খাবার, বর্তমানে স্কুলে স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের সাদরে আপ্পায়ণ করে চলেছে। তবুও অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে দৈনিক দু'পাঁচ টাকা হাতে না-পেলে স্কুলে যেতে নারাজ হয়ে পড়ে। বাড়ির উদ্দ্যোগে টিফিন সরবরাহে অক্ষম - এমন পরিবার আজকাল তেমন নেই বললে ভুল কিছু বলা হবেনা। অনগ্রসর শ্রেণি ও দরিদ্র পরিবারগুলি সরকারি একাধিক প্রকল্পের সুবিধা ভোগী। একশো দিনের নিশ্চিত কাজ এবং দু'টাকা কিলো দরে চাউল-এর সুবাদে তাদের আর অনাহারে দিন-গুজরানোর কথা নয়। শ্রমিক মুজুরীও বেড়েছে। ফলে তারাও সন্তানের জন্য টিফিনের ব্যবস্থা করতে সক্ষম। অনেক পিতা-মাতা আবার স্কুলে দুপুরের খাবার সন্তানকে খেতে দিতে নারাজ থাকেন। অনেক পিতা-মাতা স্কুলের খাবার খেতে নিষেধ করেন তাঁদের সন্তানকে। পাছে ঐ খাবার খেয়ে অসুখ-বিসুখ না হয়ে পড়ে! এই ভয় দানা বেধেছে বেশ কিছু অভিভাবকের মনে। কারণ, নিকৃষ্টমানের খাবার খেয়ে, খাবারে বিষক্রিয়া ঘটে ছাত্রছাত্রী অসুস্থতার ঘটনা সংবাদপত্রের দৌলতে নতুন নয়। এমনকি মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমে মেলে। কোথাও রান্না খাবারে মেলে ইদুর, টিকটিকি, আরশোলা, মাকোরশা। যখন এগুলো কোনো বড়সড় দুর্ঘটনার শামিল হয় তা সংবাদ মাধ্যমে চোখে পড়ে। ভেজাল তেল, পচা ডিম, পোকা চাউল; নানান অভিযোগ লেগেই রয়েছে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের মুখে। তবে স্কুলে খাবার পেয়ে অন্দিত ছেলে-মেয়ে ও পরিবারও কিছছু রয়েছে বৈকি। কিন্তু এই মিড-ডে মিল খেতে গিয়ে বিষক্রিয়ায় হারাতে হয়েছে বেশ কিছু তরতাজা ফুটফুটে নিষ্পাপ শিশুর জীবন। পিতা-মাতা হারিয়েছেন তাঁদের অবলম্বন, ভবিষ্যত্, অমূল্য সম্পদ। কেউ কি পারবে ঐ শিশুদের তাদের মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে? প্রশ্ন হল - মিড-ডে মিলের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী? বলার অপেক্ষা রাখেনা - আগের তুলনায় স্কুলছুটের সংখ্যা অনেকটা কমেছে। তবে সব ছাত্রছাত্রীদের স্কুলমুখী করতে এই অমৃত সুধার পরিকল্পনা তাদের শিক্ষার খোঁজ ক'জন রাখেন? পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ মামুন হোসেন জানান, 'মাসে ৪ বার জেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিতে বিশেষ পরিদর্শক কমিটির সদস্যরা সারা বছর ধরে পরিদর্শন চালাবেন।' এতে জেলার বিদ্যালয়গুলিতে পঠনের মান বড়বে। (১৫/০১, কলম)। এই উদ্দোগের সাধুবাদ প্রাপ্য। আশঙ্কা জাগে - 'তোতা কাহিনী'র মতো অবস্হা হচ্ছে নাতো? মিড-ডে মিলের প্রভাবে স্কুলছুটের সংখ্যা অবশ্যই কমেছে - এটা যেমন সত্য; তেমনি এটাও সমভাবে মানে হবে - নানা কারণে ছাত্রছাত্রীদের উপর শিক্ষকদের প্রহার ও শাস্তি দানের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করে বন্ধ করা এবং অযাচিত ভাবে পড়াশোনার জন্য চাপাচাপি ও তাগিদ দেওয়ার প্রবণতা স্কুলগুলি থেকে আগের তুলনায় সভাবত অনেকটা কমে পড়া, স্কুলছুট হ্রাসের একটি অন্যতম কারণ। একসময় শিক্ষকদের নিষ্ঠুর শাস্তি ও বেত্রাঘাতের ভয়ে পড়া না-পেরে স্কুল ছাড়তে দেখাগেছে অনেক ছাত্রকে। ভুখা-পেটে পড়াশোনা না-ঢোকার ঘটনাও শামিল। নিয়মিত ফেল হয়ে স্কুল পরিত্যাগ করতে হয়েছে অল্প দিনে। তাই পাশফেল প্রথা তলানিতে ঠেকতে ফেল হয়ে স্কুল ছাড়তে হয়না আগের মতো। বদলেছে প্রশ্নপত্রের ধরণ, পরীক্ষা পদ্ধতি।
মিড-ডে মিলের সুবাদে দরিদ্র শ্রেণির কিছু মহিলা সনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে কাজ পেয়েছেন; রাধুনির কাজ। কিছু সবজি, মুদির দোকানে বেড়েছে কেনা-বেচা। স্কুলে দুপুরের খাবার থেকে অধিকাংশ রাধুনির সংগ্রহীত হয় একবেলার আহার, পরিবারও ফাঁক যায়না অনেক সময়। স্কুলে চাউল, ডাল, সবজি, সওয়া বড়ি, ডিম ইত্যাদি সামগ্রী যে উপস্হিত ছাত্রছাত্রীপিছু বরাদ্দ থাকে - সবার জানা। তবু রাধুনিরা দু'মুঠো খাবারের আশা করে তাদের বানানো খাবার থেকে। না জুটলে কটুকথা উপস্হিত শিক্ষক/সহায়িকদের কপালে ঠিক জুটে যায়। অবুঝ কিছু রাধুনি মানতে নারাজ। মিড-ডে মিল প্রকল্প সৎ থাকাকে নবএকপ্রকার চ্যালেঞ্জের সম্মুখে এনে দাঁড় করেছে। ভালো মানুষকেও চুরির রাস্তা দেখাচ্ছে এই অমৃত সুধা। রাধুনিদের আশা মেটাতে বা খরচের হিসাব মেলাতে চুরি-পন্থা ছাড়া উপায় থাকবে কি? মিড-ডে মিলে চাউল যেমন নির্দিষ্ট পরিমাণে ছাত্র/ছাত্রীপিছু বরাদ্দ থাকে, তেমনি জ্বালানি, তেল, সবজি, ডিম বাবদ একটি নির্দিষ্ট অংকের অর্থ বরাদ্দ থাকে উপস্হিত পড়ুয়াপিছু। কিন্তু বছরের সবসময় উক্ত সামগ্রীর দাম নির্দিষ্ট থাকে না। অথচ বছরের সবসময় মিড-ডে মিল মেনু ও বরাদ্দ অর্থ নির্দিষ্ট। তাই কখনো অর্থের ঘার্তি, সাশ্রয় দেখা দেয়। ফলে হিসাব মেলাতে এদিক ওদিক এর সাহায্য দরকার পড়ে। মিড-ডে মিলে বাজার করা, হিসাব রাখার দায়িত্ব রাধুনিদের হলেও অধিকাংশ রাধুনি লেখাপড়া না জানার কারণে হিসাব রাখতে অসামর্থ্য হওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পারিশ্রমিকহীন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কাঁধে নিতে হয় স্কুলের কোনো এক সহশিক্ষক/সহায়িকাকে। পড়ানো ছাড়া শিক্ষকদের আরো অনেক কাজ থেকে থাকে। প্রস্তুতিকালীন মূল্যায়নের খাতা সারা, পরীক্ষা নেওয়া ও খাতা দেখা, অন্যান্য কাজ, কারো কারো দায়িত্বে আছে ভোটের ডিও, বিএলও-এর আর্জেন্ট কাজ। ফলে এসব সামাল দিয়ে দৈনন্দিন বাজারের হিসাব রাখার দায়িত্ব সামাল দিতে স্কুলে পড়াশোনার কিছুটা হলেও ব্যঘাত ঘটার সম্ভাবনা প্রবল। দৈনিক পড়াশোনার এই ঘার্তি বছর শেষে বড় ক্ষামতিতে পরিণত হয়। ফলতঃ শিক্ষার্থীরা বার্ষিক মূল্যায়নে গণটোকাটুকিতে শামিল হয়; নতুবা মার্কশিটে নম্বরের ভাটা, খরা নামে। অন্যদিকে, বিনা পারিশ্রমিকে দৈনিক অতিরিক্ত ঝামেলা বয়েবেরাবেন কেন একজন শিক্ষক/সহায়িকা? তিনি কি সবজির ব্যবসা শুরু করবেন লাভের আশায়? একজন শিক্ষকের পক্ষে তা করা নেহাত স্বপ্ন। তবু বেকার খেটে মিলবে কটুকথা ও চোর অপবাদ। মিড-ডে মিলে গাফিলতির দায়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক গেরেফতারের ঘটনা গণমাধ্যমে মিলছে। দোকানদারও। ফলে কলঙ্কিত হচ্ছে শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষাক্ষেত্র। অনেক শিক্ষকের মিড-ডে মিলে অনাগ্রহ তাঁদের অভিমত-এই প্রকাশ পায়। মিড-ডে মিল চালানোর অর্থ পাওয়া যায় অগ্রিম খরচ চালিয়ে হিসাব পাঠিয়ে। খরচ চালানোর এই অগ্রিম অর্থের পরিমাণ নেহাত কম নয়। দরিদ্র সংসার চালিয়ে এই অগ্রিম অর্থ গুনে টাকা ঝুলিয়ে রাখার সামর্থ্য রাধুনিদের থাকে না। ফলে বাধ্য হয়ে কোনো এক শিক্ষককে দায়িত্ব নিতে হয়। প্রাথমিক, এসএসকে, এমএসকের শিক্ষককে কোথাও ছাত্রদের সবজি দোকানে দেখা মেলে। মিড-ডে মিলের বাজার করা ও হিসাব রাখার উপযুক্ত একটি লোক রাধুনির দলে থাকলে এই সমস্যার সমাধান মিলবে। স্কুলে­ দুপুরের খাবার খাওয়ার পরে অধিকাংশ বাচ্চা বাড়িমুখী হয়ে পড়ে। বাড়ি সংলগ্ন স্কুল হওয়ার সুবাদে কিছু ছাত্রছাত্রী ভাত নিয়ে থালা হাতে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। বাকি প্রিয়োডগুলো কাটে মনযোগহীন ও কম পড়ুয়াতে। সব কাজের ফাঁকে একটু বিরতি প্রয়োজনীয়। পড়াশোনার ক্ষেত্রেও। স্কুলে টিফিন প্রিয়োডটুকু ছাত্রছাত্রীরা বিরতিরুপে সময় কাটিয়ে থাকে। কিন্তু মিড-ডে মিলের দৌলতে এই সময়টুকুও বিরাম থাকল না; দৈনিক থালা হাতে খেতে-ই ব্যস্ত থাকতে হয়। 'দুপুর বেলায় খাওয়ার পরে ঘুমাতে ইচ্ছে করে' - এই বঙ্গসন্তানের খাওয়ার পরে কতটা মনযোগ থাকছে তা পরিদর্শনের বিষয়। বর্তমান­ে সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আনাচে কানাচে গজে উঠছে বেসরকারি মিশনারী, নার্সারিগুলি। সেখানে নেই দুপুরের খাবারের ব্যবস্হা, ননেই সরকারি সুযোগ সুবিধা। বরং মাসিক ফিতে পড়াতে হয় সন্তানকে। তবু নার্সারিগুলি ছাত্রছাত্রীতে পরিপূর্ণ থাকে। এর কারণ কী? অভিভাবকরা চায় সন্তানের শিক্ষা। প্রশ্ন ওঠে - সরকারি স্কুলে কি শিক্ষা দান হয়না? যাইহোক,­ বহু চেষ্টা ও পরিশ্রমের ফলে দেশের প্রতিটি সরকারি বিদ্যালয়ে উপস্থিত পড়ুয়াদের দুপুরে খাবার দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এটা ভারতের একটি বড় সাফল্য। এমন দিনও গেছে - রাজ্যে তথা দেশে বহু ছাত্রছাত্রী কেবল ক্ষুধার জ্বালায় স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সেখান থেকে উৎপত্তি 'শিশু শ্রমিক'-এর। বেড়েছে শিশু শ্রম। বাচ্চাদের ক্ষুধার জ্বালাকে কুকাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির দয়ালু মুখোশধারি নির্দয় ব্যক্তি তাদের বানিয়েছে 'শিশু শ্রমিক'। যে শিশু শ্রম এখনো সামাজিক ব্যধিরুপে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে মানবতাকে। এখনো এদের দেখা মেলে ইটভাঁটা, হোটেল, দোকন, পরিবহন শিল্পে। মিড-ডে মিলও এদের শ্রমের কাছে হার মানছে। তাই এদের স্কুলমুখী করতে চাই 'শিশু শ্রমিক' নির্মূল অভিযান ও যথার্থ বাস্তবায়ণ। এখনো­ কিছু কিছু ছাত্রছাত্রীর অবশ্যই মিড-ডে মিলের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সব ছাত্রছাত্রীর প্রয়োজন রয়েছে কি? অথচ একই স্কুলে কিছু ছেলেমেয়ে দুপুরে খাবার খাবে আর কিছু ছেলেমেয়ে পাবে না - তাও অবাঞ্ছিত ও দৃষ্টিকটু বিষয়। এক্ষেত্রে অনগ্রসর এলাকা ভিত্তিক স্কুল চিহ্নিত করে প্রয়োজন সাপেক্ষে মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দরিদ্র পরিবারের আর্থিক উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।
(দৈনিক কলম পত্রিকায় ৩০/০৮/২০১৫-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধ)