Followers

Showing posts with label অভিমত. Show all posts
Showing posts with label অভিমত. Show all posts

Saturday, 28 April 2018

সড়ক দূর্ঘটনা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা এবং বর্তমান অবস্থা

সড়ক দূর্ঘটনা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা এবং বর্তমান অবস্থা

হামিম হোসেন মণ্ডল (বুলবুল)



    সড়ক দূর্ঘটনা, বাস তথা যান দূর্ঘটনা নতুন বিষয় নয়। শরীর থাকলে যেমন অসুস্থতা আসবেই কোনো না-কোনো সময়, যানবাহন ব্যবহার করলে তেমন খারাপ হবে, দূর্ঘটনাও ঘটবে। - এমনটাই দেখে আসছি। নয় কি?
            অথচ, প্রতিনিয়ত কিছু সাবধানতা মেনে চললে বড় (জটিল, ঘনঘন) অসুস্থতা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব তেমনি অনেক বড়বড় বা ঘনঘন দূর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। লক্ষ্য করবেন – সাবধানতা অবলম্বন করতে করতে কোনো সময় অসতর্কতা এসে গেলে ঘটে বিপত্তি। সুতরাং, মুহুর্তের জন্যও সতর্কতা বিচ্যূতি ঘটা যাবে না, বিশেষ ক্ষেত্রে তো নয়ই।
            নতুন ইংরেজি বছর পড়তে না-পড়তেই একাধিক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনা ঘটে চলেছে রাজ্যে। ঘটে চলেছে বললাম, কারণ এই নিবন্ধটি খসড়া লেখার পরেও সুতিতে পথ দূর্ঘটনায় মৃত্যু হল এক বাইক আরোহীর-এমন অনেক খবরই পেলাম বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে। তবে অধিকাংশই যেন মুর্শিদাবাদে ঘটা। এপর্যন্ত বছরের বড় মর্মান্তিক দূর্ঘটনাটি ঘটে ২৯ জানুয়ারি জেলার দৌলতাবাদে বালিরঘাট এলাকায়। গোটাএকটি সরকারি বাস যাত্রীসমেত ভৈরবের গভীর পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে ৪৩-এর অধিক প্রাণ অকালে তলিয়ে (খোয়া) গেল। এর কিছুদিন আগে জেলার বেলডাঙ্গার বেগুনবাড়ি এলাকায় নয়নজুলি গর্তে পড়ে (বাস দূর্ঘটনা) শিশুসহ ১০/১২টা প্রাণ যায়। তবুও, যান তথা সড়ক দূর্ঘটনা থামেনি! কখনো লরি-বাইক, লরি-টুকটুক, চিংড়িহাটা বাস দূর্ঘটনা, প্রভৃতি সংঘর্ষ চলছেই। সেভ ড্রাইভ, সেভ লাইফ প্রকল্প (অনুষ্ঠান) এর পরেও খবর আসছে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট এসআইযদিও তুলনামূলক ভাবে মোটর-বাইক দৌরত্ব বেশ কমেছে।
            প্রসঙ্গতঃ, কলম (০২ ফেব্রুয়ারি) অভিমতে (দূর্ঘটনা রোধে সেই সচেতনতা কোথায়?) হক সাহেব লেখেন, মুর্শিদাবাদের দৌলতাবাদে বাস দূর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে পরিবহণ দফতর, বাসচালক ও মালিক, সাধারণ মানুষ ও পুলিশ-প্রশাসনের দারিত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবৃন্দেরএখন বিযয় হল – যা (ঘটনা বা বিযয়) থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা যায় তা বেশি বেশি হোক, দেখতে চাই ও অন্যদের দেখার পরামর্শ দিই। ধরুন – ইসলামি জালসা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা যায়, তাই প্রতি তা হোক, শুনি ও অন্যরা শুনুক তাই চাই। পত্রদাতা দূর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পরামর্শ দিয়েছেন সবাইকে। তবেকি দূর্ঘটনা যত ঘটবে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তত বাড়বে? দূর্ঘটনা থেকে শিক্ষা কেন নিতে হবে? মানুষ কি এতোই পিছিয়ে পড়েছে হঠাৎ! বাসচালক, পুলিশ-প্রশাসন কি যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়? যথাযথ প্রশিক্ষণ নিয়ে উপযুক্তরা বাসচালক কিংবা পুলিশ-প্রশাসনের সদস্য হন। প্রবাদ আছে – চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। - সেই বুদ্ধি কি কোনো কাজে লাগে? লাগে না। আগুনে হাত দিলে জালা করে – এটা সবাই জানে, সদ্যজাত বা নিতান্ত শিশু বাদে। এখন যদি আগুনে হাত দিয়ে শিখতে বা জানতে চান, তবে শিক্ষা এগুবে কিকরে!

           

দৌলতাবাদে বাস দূর্ঘটনায় প্রধানত চালকের মোবাইলকে দায়ি করা হয়েছে। কখনো কখনো শিতের কুয়াশার বিষয় উঠে এসেছে। দূর্ঘটনাটি গবেষণা করে –
মোবাইল কানে ড্রাইভ নিশিদ্ধ হয়েছে। মনে হতেপারে যেন মোবাইল-ই দায়ি। আসলে দায়িত্ব চালকের। এটা তো সাবধানতা! বেশ কিছু মানুষের মস্তিষ্ক আসলে এতটাই অপরিণত (বলে মনে হয়) – গাড়ি, মোবাইলকে খেলনা ভেবে বসে। আমেরিকায় বন্দুক যেন খেলনায় পরিণত হয়েছে, আমেরিকায় ফের স্কুলে বন্দুকধারী ছাত্রের গুলী – এমনটাই বোঝায়।
            প্রকৃতপক্ষে, কখন, কোথায়, কোন্ জিনিস, কতটা ব্যবহার করতে হয়/হবে অথবা হয়না/হবেনা – বুঝতে হবে পরিণত সুস্থ মস্তিষ্কে। আপনার উপর পাথর ছুড়ে পাথরের দায় দিলে তো চলবে না।
            তবে সাবধানতার পরেও দূর্ঘটনা ঘটলে সাধারণত এতো মারাত্মক আকার নেয় না অথবা এতো ঘনঘন সংগঠিত হয় না। কোনো মর্মান্তিক দূর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে দেখবেন – কোনো গাফিলতি, অসতর্কতা, অসাবধানতা-ই উঠে আসবে/আসে। ছোট ছোট দূর্ঘটনার দিকে দেখুন – জানবেন সাবধানতা ও সতর্কতার জন্য মারাত্মক দূর্ঘটনার থেকে রেহায় মিলেছে।
            মনে রাখবেন – মানুষে তথা জীবজগতের বেঁচে থাকাটাই আশ্চর্যের। তাই বেঁচে থাকতে হলে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম চালাতে হয়, জীবনসংগ্রাম। দূর্ঘটনা থেকে বাঁচতেও প্রতিনিয়ত সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। কথায় আছে – সাবধানতার মার নেইঅন্যথায় জীবন সংকটাপন্ন।
            অনেক সময় অনেক জায়গায় জীর্ণ কিংবা সংকীর্ণ রাস্তা ও কমজোর সেতু দূর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মুর্শিদাবাদ জেলায় দূর্ঘটনা সম্ভাবনা এমন প্রায় অনেকগুলি রাস্তা ছিল এবং সেতুর সংখ্যা বর্তমান। বহরমপুরে বহুল ব্যবহৃত রামেন্দ্র সুন্দর সেতু ওরফে রাধার ব্রীজটি ভালো নেই, হরিহরপাড়া ও পিঁপড়াখালি সেতুটি দূর্ঘটনার ভয় দেখায়। ইত্যাদি ইত্যাদি আরও রয়েছে। কথায় রয়েছে – দূর্ঘটনার হাত-পা নেয়। দূর্ঘটনা ও ভয় কাটাতে এগুলো নিরাপদ রাখা একান্ত প্রয়োজন।
            আমার যাত্রা পথে প্রাসঙ্গিক অনেক ঘটনার মধ্যে দুএকটি বলছি শুনুন। কিছুমাস আগে একদিনের ঘটনা। বহরমপুরে যাবো, ত্রিমোহিনী মোড়ে বাসে উঠি। আসন না মেলায় অগত্যা কেবিনে একটু ঠেসাঠেসি করে বসতে হল। বাস চলল, এসময় চালক ও পাশে বসা এক যাত্রীর কথোপোকথনের মাঝে চালক বলল, এই বাসটি ভালো নয়, স্টেয়ারিং ঠিকঠাক নিজের মতে ঘোরে না, সমস্যা হয়, আমি বলে চালাচ্ছি, অন্য কেউ চালাবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি। সেদিন চালকের কথাগুলি মনে ধরেছিল (বাহাদুর চালক হিসেবে), কিন্তু গাড়ি ও চালককে মনে রাখা হয়নি (মস্তিষ্কের অবস্থান ছিল - এটা কোনো বিষয় নয়)। - এটা কি চালকের বাহাদুরি? এক্ষেত্রে দূর্ঘটনা না-ঘটাটাই অস্বাভাবিক নয় কি? হয়তো চলকদের দক্ষতার জন্য তা স্বাভাবিক হয়ে যায়!
            অন্য একদিন, সম্প্রতি, বহরমপুর থেকে ফিরছি, গন্তব্যস্থাল ঝাউবনা মোড়। গাড়িটিতে সিটের পেছনে ক্রমিক নম্বর নেই, আছে জানালার পাশে গায়ে, লব/হর আকারে। এক্ষেত্রে কোন্ নম্বরটা (লব/হর) জানালার পাশে – বচসার সুযোগ থাকে। এজন্যই কি সিটের পাছনে সিট নম্বর রাখেনা কিছু বাস? এটা বাস্তব। দুএকটি স্টপেজ নিতেই ভিরে ঠেসাঠেসি, দরজা বন্ধ রাখার উপায় থাকছেনা এমন। এর মধ্যে থেকে কেউ (যাত্রী) তেজ দেখিয়ে বলে উঠল, বাসে চড়লে ঠেলাঠেলি, গুতাগুতি, ধাক্কাধাক্কি, কষ্ট হবেই; তা নাহলে ব্যক্তিগত গাড়িতে যেতে হবে। প্রশ্ন হল – বাস তথা যান সফরে গন্তব্যস্থানে পৌঁছোনটাই কি মূল লক্ষ্য? নাকি আদবের সহিত সুস্থ শরীরে পৌঁছোনটা? – এমন গাড়িতো সাধারণত দূর্ঘটনা সম্ভাবনা! নয় কি? – সুতরাং, গাড়িতে যাত্রীভিড় নিয়ন্ত্রণ ও সুস্থ যাত্রার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বাসটি সারগাছি মোড় সংলগ্ন আসতেই বন্ধ হয়ে পড়ে। নাকি বাসে কিছু সমস্যা ঘটেছে। কিছু টাইট দিতে হবে, রেঞ্জ খুঁজে মিলছে না, আবশেষে কোনো এক অবস্থানে মিলল। এমন সময় এক যাত্রী জানাল, সকালে সে এই গাড়ে শহরে গিয়েছিল, তখনই কিছু খারাপ ছিল বলে সারাতে বলছিল চালক। তারপরেও সারানো নাহলে দূর্ঘটনার কবলে পড়া কি স্বাভাবিক ঘটনা নয়? – খারাপ বা অসুবিধাজনক গাড়ি বা যান না সারিয়ে রাস্তায় নামানো যান না হয় – বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। মাথায় রাখতে হবে – গাড়ি কিংবা মোবাইল খেলনা নয় এবং মানুষও পুতুল নয়।

            আর, গাড়ি চালানোর সময় চালক যেন কোনো মাধ্যমেই অন্যকারো সঙ্গে গল্প বা কথোপকথোনে না মাতেন। শিতের কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্ত প্রয়োজন মতো দেখা না গেলে সে যাত্রা বাতিল বা বিলম্ব করা দরকার, রেলযাত্রার মতো। কারণ, জীবনের দাম অনেক বেশি।

Friday, 29 December 2017

উপর্জন ও অর্জিত সম্পদ হোক বৈধ, উপায় হোক সৎ ও হালাল


উপার্জন ও অর্জিত সম্পদ হোক বৈধ,
উপায় হোক সৎ এবং হালাল

কাজে ফাঁকি মারা মানুষ জাতির একটি সহজাত প্রবিত্তি হয়ে দেখা দিয়েছে। ‘ফাঁকি মারলে নিজেই সেই ফাঁকে পড়ে’ – এমন বিজ্ঞাপন আমরা দূরদর্শনে দেখেছি। কাজে ফাঁকি বা গাফিলতি দিয়ে পারিশ্রমীক নেওয়া হারাম যা গুনাহ্ বা পাপের পর্যায়ভুক্ত। লোকমুখে প্রচলিত আছে, কাজে ফাঁকি দিয়ে, অন্যকে ঠকিয়ে বা অন্যায় বা অবৈধ ভাবে আয় বা উপার্জন করলে বা সম্পদ করলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না বা বেশিদিন টেকে না। বর্তমানে আধুনিক যুগে এই প্রচলিত ধ্যান ধারণার পরিবর্তন ঘটতে দেখা যাচ্ছে। হিংসার বসবর্তি হয়েই হোক বা আবেগে অথবা অধৈর্য হয়ে কিংবা আফশসের সুরে অনেককেই বলতে শোনা যাচ্ছে – কৈ! অনেকেইতো হাব্বিতাব্বি (বিপথে, আপথে, হারাম উপায়ে) মেরে অনেক উপার্জন করছে, আর দিব্বি আছে(ন) টিকে সুহালে। আসলে বর্তমান প্যাশনেবল মানুষ অর্থসর্বস্ব ও মর্ডান হয়ে পড়েছেন যে সাধারণ পাপ-পুর্ণের যথাযথ ইসলামিক জ্ঞানটুকুও সুপ্ত হতে শুরু করে দিয়েছে।

আরে ভাই, মানুষ ঠকিয়ে অন্যায় (হারাম) পথে উপার্জন করলে বা সম্পদ করলে তা টেকসই বা দীর্ঘস্থায়ী হোক বা না হোক – তাকি ইসলাম সমর্থন করে নাকি মানুষ বা রাষ্ট্রের আইন সমর্থিত? না। বরং ইসলাম ব্যক্তির হালাল রুজির কথা বলে, হারাম থেকে দূরে থাকতে ও তা বর্জন করতেই আদেশ দেয়। এখানে, হালাল বলতে কেবল বস্তু বা দ্রব্যের উপাদান সমূহ হালাল হলেই চলবে না, আমরা যার বিনিময়ে (পারিশ্রমিক ও সম্পদ) সে সব বস্তু বা দ্রব্যাদি সংগ্রহ করছি তাও হালাল হওয়া বাঞ্ছনীয়; একজন মুসলমানের নিকট তথা ইসলামে তা আবশ্যিক। ন্যায্য জিনিস ন্যায্য মূল্যের বিনিময় আবশ্যিক। অর্থাৎ, ব্যবহারিক বস্তু বা দ্রব্য ও তার প্রস্তুতকারী উপাদান যেমন হালাল হতে হবে তেমনি পারিশ্রমিক, উপার্জন, সম্পদ, বিনিময় মূল্য হালাল হতেই হবে এবং কেনাবেচা ন্যায্য (মূল্যে) ও বৈধ হওয়া বাঞ্ছনীয় ও আবশ্যিক।



কেউ চুরি করে বা মানুষ ঠকিয়ে কিংবা অন্যায় ভাবে উপার্জন করলে বা সম্পদ করলে সেই অর্থ ও সম্পদ দিয়ে পরবর্তিতে যা উপার্জন করবে বা তা থেকে যা আসবে বা কিনবে সবই হারামের পর্যায়ভুক্ত হবে না কি? একটু ভেবে দেখুন। আর সেই সম্পদ দীর্ঘস্থায়ী হলে জানতে হবে – এটাই তার দূর্ভাগ্য এবং আল্লাহ্-র গজব, বেতরাজি। বরং, অন্যায় উপার্জন বা হারাম সম্পদ দীর্ঘস্থায়ী না হলে, নষ্ট হলে – এটা তার সৌভাগ্য, যে পাপের বোঝা বা জমি তাকে বেশিদিন বহন করতে হবে না। ভালো কজের জন্য যেমন সোয়াব (ভালো ফল) পাওয়া যায়, তেমনি মন্দ কাজের জন্যও রয়েছে বিপরীতটি। একটি আম গাছ লাগালে যেমন যথদিন গাছটি থাকবে আম (ফল) দেবে, তেমনি বিচুটি বিছোলে ততদিন চুলকোবে। - এটাই স্বাভাবিক, সত্য।

তাই বলি, অন্ধের মতো অর্থসর্বস্ব উপার্জন ও সম্পদের সংগ্রহের দিকে না ছুটে সৎ, ন্যায় তথা হালাল উপার্জনে মননিবেশ ঘটান, সে স্বল্পই হোকনা কেন। মনে রাখবেন, মুসলমান হিসেবে আমাদের মূল উদ্দেশ্য ইসলাম পালন করা, আর তার জন্য প্রাথমিক ভাবে প্রয়োজন হালাল রুজি (উপার্জন, সম্পদ, সামগ্রি)। আপনি যতই রোজগার করুন না কেন, যতই সম্পদ করুন – তা হালাল বা সৎ, ন্যায় উপায়ে অর্জিত ও হালাল না হলে আপনি প্রকৃতপক্ষে হতভাগা ও দরিদ্র তথা নিচ। - নয় কি?
‘দেশের ৪ কোটি মুসলিমের ইসলাম সম্পর্কে ধারণা নেই, আক্ষেপ মাদানির’ (কলম, ১ নভেম্বর) – বিষয়টি প্রাসঙ্গিক, বাস্তবোচিত ও অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। ‘শুধু নামেই মুসলিম। ইসলাম সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণাটুকুও নেই।’ ‘মুসলিমদের এই অজ্ঞতা নিয়ে আক্ষেপপ্রকাশ করলেন জামিয়ত উলেমায়ে হিন্দের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মাহমুদ মাদানি।’ মাদানি যথার্থই সঠিক ও উচিৎ কথাই বলেছেন।

Click Here for More ... (দৈনিক কলম, অভিমত, ১৪/১১/২০১৭, 'প্রসঙ্গ : ইসলাম সম্পর্কে ধারণা')

Sunday, 24 December 2017

মিড ডে মিল, বিদ্যালয় শিক্ষা ব্যবস্থা ও বাস্তবতা

দৈনিক কলম পত্রিকায় ৩০/০৮/২০১৫

মিড-ডে মিল অর্থাত্ দুপুরের খাবার, বর্তমানে স্কুলে স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের সাদরে আপ্পায়ণ করে চলেছে। তবুও অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে দৈনিক দু'পাঁচ টাকা হাতে না-পেলে স্কুলে যেতে নারাজ হয়ে পড়ে। বাড়ির উদ্দ্যোগে টিফিন সরবরাহে অক্ষম - এমন পরিবার আজকাল তেমন নেই বললে ভুল কিছু বলা হবেনা। অনগ্রসর শ্রেণি ও দরিদ্র পরিবারগুলি সরকারি একাধিক প্রকল্পের সুবিধা ভোগী। একশো দিনের নিশ্চিত কাজ এবং দু'টাকা কিলো দরে চাউল-এর সুবাদে তাদের আর অনাহারে দিন-গুজরানোর কথা নয়। শ্রমিক মুজুরীও বেড়েছে। ফলে তারাও সন্তানের জন্য টিফিনের ব্যবস্থা করতে সক্ষম। অনেক পিতা-মাতা আবার স্কুলে দুপুরের খাবার সন্তানকে খেতে দিতে নারাজ থাকেন। অনেক পিতা-মাতা স্কুলের খাবার খেতে নিষেধ করেন তাঁদের সন্তানকে। পাছে ঐ খাবার খেয়ে অসুখ-বিসুখ না হয়ে পড়ে! এই ভয় দানা বেধেছে বেশ কিছু অভিভাবকের মনে। কারণ, নিকৃষ্টমানের খাবার খেয়ে, খাবারে বিষক্রিয়া ঘটে ছাত্রছাত্রী অসুস্থতার ঘটনা সংবাদপত্রের দৌলতে নতুন নয়। এমনকি মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমে মেলে। কোথাও রান্না খাবারে মেলে ইদুর, টিকটিকি, আরশোলা, মাকোরশা। যখন এগুলো কোনো বড়সড় দুর্ঘটনার শামিল হয় তা সংবাদ মাধ্যমে চোখে পড়ে। ভেজাল তেল, পচা ডিম, পোকা চাউল; নানান অভিযোগ লেগেই রয়েছে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের মুখে। তবে স্কুলে খাবার পেয়ে অন্দিত ছেলে-মেয়ে ও পরিবারও কিছছু রয়েছে বৈকি। কিন্তু এই মিড-ডে মিল খেতে গিয়ে বিষক্রিয়ায় হারাতে হয়েছে বেশ কিছু তরতাজা ফুটফুটে নিষ্পাপ শিশুর জীবন। পিতা-মাতা হারিয়েছেন তাঁদের অবলম্বন, ভবিষ্যত্, অমূল্য সম্পদ। কেউ কি পারবে ঐ শিশুদের তাদের মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে? প্রশ্ন হল - মিড-ডে মিলের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী? বলার অপেক্ষা রাখেনা - আগের তুলনায় স্কুলছুটের সংখ্যা অনেকটা কমেছে। তবে সব ছাত্রছাত্রীদের স্কুলমুখী করতে এই অমৃত সুধার পরিকল্পনা তাদের শিক্ষার খোঁজ ক'জন রাখেন? পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ মামুন হোসেন জানান, 'মাসে ৪ বার জেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিতে বিশেষ পরিদর্শক কমিটির সদস্যরা সারা বছর ধরে পরিদর্শন চালাবেন।' এতে জেলার বিদ্যালয়গুলিতে পঠনের মান বড়বে। (১৫/০১, কলম)। এই উদ্দোগের সাধুবাদ প্রাপ্য। আশঙ্কা জাগে - 'তোতা কাহিনী'র মতো অবস্হা হচ্ছে নাতো? মিড-ডে মিলের প্রভাবে স্কুলছুটের সংখ্যা অবশ্যই কমেছে - এটা যেমন সত্য; তেমনি এটাও সমভাবে মানে হবে - নানা কারণে ছাত্রছাত্রীদের উপর শিক্ষকদের প্রহার ও শাস্তি দানের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করে বন্ধ করা এবং অযাচিত ভাবে পড়াশোনার জন্য চাপাচাপি ও তাগিদ দেওয়ার প্রবণতা স্কুলগুলি থেকে আগের তুলনায় সভাবত অনেকটা কমে পড়া, স্কুলছুট হ্রাসের একটি অন্যতম কারণ। একসময় শিক্ষকদের নিষ্ঠুর শাস্তি ও বেত্রাঘাতের ভয়ে পড়া না-পেরে স্কুল ছাড়তে দেখাগেছে অনেক ছাত্রকে। ভুখা-পেটে পড়াশোনা না-ঢোকার ঘটনাও শামিল। নিয়মিত ফেল হয়ে স্কুল পরিত্যাগ করতে হয়েছে অল্প দিনে। তাই পাশফেল প্রথা তলানিতে ঠেকতে ফেল হয়ে স্কুল ছাড়তে হয়না আগের মতো। বদলেছে প্রশ্নপত্রের ধরণ, পরীক্ষা পদ্ধতি।
মিড-ডে মিলের সুবাদে দরিদ্র শ্রেণির কিছু মহিলা সনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে কাজ পেয়েছেন; রাধুনির কাজ। কিছু সবজি, মুদির দোকানে বেড়েছে কেনা-বেচা। স্কুলে দুপুরের খাবার থেকে অধিকাংশ রাধুনির সংগ্রহীত হয় একবেলার আহার, পরিবারও ফাঁক যায়না অনেক সময়। স্কুলে চাউল, ডাল, সবজি, সওয়া বড়ি, ডিম ইত্যাদি সামগ্রী যে উপস্হিত ছাত্রছাত্রীপিছু বরাদ্দ থাকে - সবার জানা। তবু রাধুনিরা দু'মুঠো খাবারের আশা করে তাদের বানানো খাবার থেকে। না জুটলে কটুকথা উপস্হিত শিক্ষক/সহায়িকদের কপালে ঠিক জুটে যায়। অবুঝ কিছু রাধুনি মানতে নারাজ। মিড-ডে মিল প্রকল্প সৎ থাকাকে নবএকপ্রকার চ্যালেঞ্জের সম্মুখে এনে দাঁড় করেছে। ভালো মানুষকেও চুরির রাস্তা দেখাচ্ছে এই অমৃত সুধা। রাধুনিদের আশা মেটাতে বা খরচের হিসাব মেলাতে চুরি-পন্থা ছাড়া উপায় থাকবে কি? মিড-ডে মিলে চাউল যেমন নির্দিষ্ট পরিমাণে ছাত্র/ছাত্রীপিছু বরাদ্দ থাকে, তেমনি জ্বালানি, তেল, সবজি, ডিম বাবদ একটি নির্দিষ্ট অংকের অর্থ বরাদ্দ থাকে উপস্হিত পড়ুয়াপিছু। কিন্তু বছরের সবসময় উক্ত সামগ্রীর দাম নির্দিষ্ট থাকে না। অথচ বছরের সবসময় মিড-ডে মিল মেনু ও বরাদ্দ অর্থ নির্দিষ্ট। তাই কখনো অর্থের ঘার্তি, সাশ্রয় দেখা দেয়। ফলে হিসাব মেলাতে এদিক ওদিক এর সাহায্য দরকার পড়ে। মিড-ডে মিলে বাজার করা, হিসাব রাখার দায়িত্ব রাধুনিদের হলেও অধিকাংশ রাধুনি লেখাপড়া না জানার কারণে হিসাব রাখতে অসামর্থ্য হওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পারিশ্রমিকহীন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কাঁধে নিতে হয় স্কুলের কোনো এক সহশিক্ষক/সহায়িকাকে। পড়ানো ছাড়া শিক্ষকদের আরো অনেক কাজ থেকে থাকে। প্রস্তুতিকালীন মূল্যায়নের খাতা সারা, পরীক্ষা নেওয়া ও খাতা দেখা, অন্যান্য কাজ, কারো কারো দায়িত্বে আছে ভোটের ডিও, বিএলও-এর আর্জেন্ট কাজ। ফলে এসব সামাল দিয়ে দৈনন্দিন বাজারের হিসাব রাখার দায়িত্ব সামাল দিতে স্কুলে পড়াশোনার কিছুটা হলেও ব্যঘাত ঘটার সম্ভাবনা প্রবল। দৈনিক পড়াশোনার এই ঘার্তি বছর শেষে বড় ক্ষামতিতে পরিণত হয়। ফলতঃ শিক্ষার্থীরা বার্ষিক মূল্যায়নে গণটোকাটুকিতে শামিল হয়; নতুবা মার্কশিটে নম্বরের ভাটা, খরা নামে। অন্যদিকে, বিনা পারিশ্রমিকে দৈনিক অতিরিক্ত ঝামেলা বয়েবেরাবেন কেন একজন শিক্ষক/সহায়িকা? তিনি কি সবজির ব্যবসা শুরু করবেন লাভের আশায়? একজন শিক্ষকের পক্ষে তা করা নেহাত স্বপ্ন। তবু বেকার খেটে মিলবে কটুকথা ও চোর অপবাদ। মিড-ডে মিলে গাফিলতির দায়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক গেরেফতারের ঘটনা গণমাধ্যমে মিলছে। দোকানদারও। ফলে কলঙ্কিত হচ্ছে শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষাক্ষেত্র। অনেক শিক্ষকের মিড-ডে মিলে অনাগ্রহ তাঁদের অভিমত-এই প্রকাশ পায়। মিড-ডে মিল চালানোর অর্থ পাওয়া যায় অগ্রিম খরচ চালিয়ে হিসাব পাঠিয়ে। খরচ চালানোর এই অগ্রিম অর্থের পরিমাণ নেহাত কম নয়। দরিদ্র সংসার চালিয়ে এই অগ্রিম অর্থ গুনে টাকা ঝুলিয়ে রাখার সামর্থ্য রাধুনিদের থাকে না। ফলে বাধ্য হয়ে কোনো এক শিক্ষককে দায়িত্ব নিতে হয়। প্রাথমিক, এসএসকে, এমএসকের শিক্ষককে কোথাও ছাত্রদের সবজি দোকানে দেখা মেলে। মিড-ডে মিলের বাজার করা ও হিসাব রাখার উপযুক্ত একটি লোক রাধুনির দলে থাকলে এই সমস্যার সমাধান মিলবে। স্কুলে­ দুপুরের খাবার খাওয়ার পরে অধিকাংশ বাচ্চা বাড়িমুখী হয়ে পড়ে। বাড়ি সংলগ্ন স্কুল হওয়ার সুবাদে কিছু ছাত্রছাত্রী ভাত নিয়ে থালা হাতে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। বাকি প্রিয়োডগুলো কাটে মনযোগহীন ও কম পড়ুয়াতে। সব কাজের ফাঁকে একটু বিরতি প্রয়োজনীয়। পড়াশোনার ক্ষেত্রেও। স্কুলে টিফিন প্রিয়োডটুকু ছাত্রছাত্রীরা বিরতিরুপে সময় কাটিয়ে থাকে। কিন্তু মিড-ডে মিলের দৌলতে এই সময়টুকুও বিরাম থাকল না; দৈনিক থালা হাতে খেতে-ই ব্যস্ত থাকতে হয়। 'দুপুর বেলায় খাওয়ার পরে ঘুমাতে ইচ্ছে করে' - এই বঙ্গসন্তানের খাওয়ার পরে কতটা মনযোগ থাকছে তা পরিদর্শনের বিষয়। বর্তমান­ে সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আনাচে কানাচে গজে উঠছে বেসরকারি মিশনারী, নার্সারিগুলি। সেখানে নেই দুপুরের খাবারের ব্যবস্হা, ননেই সরকারি সুযোগ সুবিধা। বরং মাসিক ফিতে পড়াতে হয় সন্তানকে। তবু নার্সারিগুলি ছাত্রছাত্রীতে পরিপূর্ণ থাকে। এর কারণ কী? অভিভাবকরা চায় সন্তানের শিক্ষা। প্রশ্ন ওঠে - সরকারি স্কুলে কি শিক্ষা দান হয়না? যাইহোক,­ বহু চেষ্টা ও পরিশ্রমের ফলে দেশের প্রতিটি সরকারি বিদ্যালয়ে উপস্থিত পড়ুয়াদের দুপুরে খাবার দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এটা ভারতের একটি বড় সাফল্য। এমন দিনও গেছে - রাজ্যে তথা দেশে বহু ছাত্রছাত্রী কেবল ক্ষুধার জ্বালায় স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সেখান থেকে উৎপত্তি 'শিশু শ্রমিক'-এর। বেড়েছে শিশু শ্রম। বাচ্চাদের ক্ষুধার জ্বালাকে কুকাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির দয়ালু মুখোশধারি নির্দয় ব্যক্তি তাদের বানিয়েছে 'শিশু শ্রমিক'। যে শিশু শ্রম এখনো সামাজিক ব্যধিরুপে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে মানবতাকে। এখনো এদের দেখা মেলে ইটভাঁটা, হোটেল, দোকন, পরিবহন শিল্পে। মিড-ডে মিলও এদের শ্রমের কাছে হার মানছে। তাই এদের স্কুলমুখী করতে চাই 'শিশু শ্রমিক' নির্মূল অভিযান ও যথার্থ বাস্তবায়ণ। এখনো­ কিছু কিছু ছাত্রছাত্রীর অবশ্যই মিড-ডে মিলের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সব ছাত্রছাত্রীর প্রয়োজন রয়েছে কি? অথচ একই স্কুলে কিছু ছেলেমেয়ে দুপুরে খাবার খাবে আর কিছু ছেলেমেয়ে পাবে না - তাও অবাঞ্ছিত ও দৃষ্টিকটু বিষয়। এক্ষেত্রে অনগ্রসর এলাকা ভিত্তিক স্কুল চিহ্নিত করে প্রয়োজন সাপেক্ষে মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দরিদ্র পরিবারের আর্থিক উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।
(দৈনিক কলম পত্রিকায় ৩০/০৮/২০১৫-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধ)

Saturday, 9 December 2017

বস-২ সিনেমার একটি সংলাপ প্রসঙ্গে আমার মতামত

জীৎ-শুভশ্রী অভিনিত ‘বস২’ বাংলা সিনেমার একটি গানের দৃশ্য নিয়ে ইতিমধ্যে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল।

সমস্যা দেখাদিয়েছিল গানের লিরিক্স বা কথার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ খোলামেলা কস্টিউমে মহিলাদের নৃত্য নিয়ে। শেষ পর্যন্ত ‘বস২’ মুক্তি পেল এবং বর্তমানে প্রেক্ষাগৃহগুলিতে প্রদর্শিত হচ্ছে। তবে সিনেমাটির একটি সংলাপ দর্শকের কাছে ভুল বার্তা বহন করতে পারে বলে মনে হচ্ছে। ‘বস২’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ব চরিত্র – আয়েশা। সিনেমায় আয়েশা তাঁর পিতা শাহনোয়াজ হোসেনকে বন্দুক তাক করে বলেন, আল্লাহ্ নাকি তাঁকে তাঁর মায়ের (হত্যার) প্রতিশোধ নেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন, এবং আয়েশা তাঁর পিতাকে গুলি করে হত্যা করেন (প্রতিশোধ নেন)। প্রসঙ্গত, আল্লাহ্তায়ালা বলেন, ‘অন্যায়ের প্রাপ্য শুধু সম-পরিমাণ অন্যায়। তবে যে ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয় এবং সমঝোতা করে সে আল্লাহর নিকট পুরস্কার প্রাপ্ত হবে। তিনি তো অত্যাচারীদেরকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা শূরা, আয়াত: ৪০) অর্থাৎ, যদিও সম-পরিমাণ প্রতিশোধ নেওয়া জায়েয, তবুও ধৈর্য ধারণ করা উত্তম। মাথায় রাখা উচিত, এখানে ‘সম-পরিমাণ’ কথা বলা আছে। অর্থাৎ, বেশিতো নয়ই, কমও নয়। ধরুন, যদি কেউ আমাকে চার ঘা মারে, আমি তাকে দুই ঘাও মারব – এটা সম-পরিমাণ প্রতিশোধ হতে পারে কি? পারে না। আবার, চার ঘা-এর পরিবর্তে চার ঘা – তাও কি সম-পরিমাণ হবে? কিসের মাপকাঠিতে মাপবেন? আপাত দৃষ্টিতে সম-পরিমাণ মনে হলেও দুপক্ষের চার চার ঘা-এর ভার, বল, শক্তি কোন মাপকাঠিতে সমান হবে? আবার প্রথম ব্যক্তির মারা চার ঘা-এর ব্যাথা, কষ্ট, যন্ত্রণা, মন-মানসিক চাপ কিভাবে সম-পরিমাণ রিটার্ণ (ফেরত) দেবেন বা দেওয়া যাবে। তেমন মাপকাঠি কোথায়? এক্ষেত্রে মানুষের পক্ষে এমন সূক্ষ পরিমাণ নির্ণয় – কি আদৌ সম্ভব? সিনেমায়, স্বামী (শাহনোয়াজ) তাঁর স্ত্রীকে গুলিবিদ্ধ করে খুন করেন, প্রতিশোধে মেয়ে (আয়েশা) তাঁর পিতাকে (শাহনোয়াজ) গুলিবিদ্ধ করে খুন করেন। - এই দুটি ঘটনা কি সমান মনে হচ্ছে? তাছাড়া মৃত্যুর সময় স্ত্রীর (আয়েশার মা) যা কষ্ট হয়েছে, পিতার (আয়েশার পিতা)ও কি সম-পরিমাণ কষ্ট, যন্ত্রণা হয়েছে; সমান রক্ত ঝরেছে, সময়-কাল-স্থান-পাত্র কি সম ছিল? তবে ধৈর্য ধরাণ করে সুবিচার (বা প্রতিশোধের ভার) আল্লাহর কাছে প্রার্থণা করা উচিত। আর প্রয়োজনে অত্যাচারীদের পৃথিবীতে আইনের হাতে তুলে দিন, নিজে আইন হাতে তুলে নেবেন না। - এটা ইসলাম সমর্থিত। 

Sunday, 8 May 2016

গীবত : একটি সামাজিক অপরাধ



কলম-এ দ্বীন দুনিয়া ক্রোড়পত্রের পাতায় ৪ ডিসেম্বর যুগোপযোগী এবং মূল্যবান বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেছেন জনাব আবুল হাসান 'গীবত : একটি সামাজিক অপরাধ' নিবন্ধের মধ্য দিয়ে বাস্তবসম্মতভাবে। তাঁর এই তথ্যপূর্ণ দলিল সম্মলিত আলোকপাতের জন্য বিশেষভাবে তাঁর জন্য দোয়া রইল। লেখাটি প্রকাশের জন্য কলম, পাঠক ও গীবত থেকে বাঁচাতে সদিচ্ছুকদের জন্যও রইল দোয়া। সর্বপরি সুপথ অবলম্বনে সচেষ্ট সকলের জন্যই দোয়া রইল।
আমার মতে, কারো দোষত্রুটি, ভুলত্রুটি অন্যের কানে তোলা বা পৌঁছে দেওয়াই হল 'গীবত''গীবত' বা 'পরচর্চা'। তাঁর উপস্থিতিতেও (তাঁর বিনা অনুমতিতে) অন্যের কাছে তাঁর দোষত্রুটি বা ভুলত্রুটি তুলেধরাও কিন্তু অন্যায়, অপরাধ। পবিত্র কুরআনের সতর্ক বাণী, 'তোমরা অন্যের দোষ খুঁজে বেড়াবে না।' (সূরা হুজুরাত, আয়াত : ১২)
উল্লেখ্য, হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা দিয়েছেন, হযরত মুহাম্মাদ সা. বলেছেন : 'তোমরা কি জানো গীবত কাকে বলে?' সাহাবীরা বললেন : 'আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল সা. ভালোই জানেন।' উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ সা. বললেন : 'তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে - সেটাই গীবত।' - যথার্থ।
    কারো দোষত্রুটি বা ভুলত্রুটি দেখলে তা দ্বিতীয় ব্যক্তি বা অন্য কারো কানে না-তুলে, অপরাধ তথা পাপের পাল্লা ভারী না-করে, প্রয়োজনে তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে গোপনে তাঁর সমর্থন আদায়ের মধ্য দিয়ে সুসঙ্গতভাবে সংশোধন যোগ্য হলে তাঁর দোষত্রুটি বা ভুলত্রুটি সংশোধনে সাহায্য করা প্রয়োজন; কিন্তু কোনভাবেই পিড়াপিড়ি, সম্মানহানী, বিতশ্রদ্ধা বা মনমালিন্য করা অনুচিত।
লেখক উল্লেখ করেছেন গীবত থেকে বাঁচার যথার্থ তিনটি উপায়ের কথা। সবচেয়ে কার্যকারী ও গীবত এড়ানোর বাস্তব উপায় হল - বাক্ সংযম অবলম্বন করা। এই প্রসঙ্গে যথার্থ বলেছেন :
  'যত কথা কম বলা যায় তত বেশি গীবত থেকে বাঁচা যাবে। অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। চুপ থাকা ইবাদাতও বটে। একবার আল্লাহর রাসূল সা. বলেছিলেন, 'হে আবু যর! আমি কি তোমাকে এমন একটা গুনের কথা বলব না, যা বহন করতে হালকা কিন্তু মীযানের পাল্লায় খুব ভারী?' হযরত আবু যর রা. বললেন, 'হ্যাঁ।' রাসূলুল্লাহ্ সা. বললেন, 'দীর্ঘ সময় ধরে নীরব থাকা ও উত্তম ব্যবহার।' (মিশকাত)।'
কিন্তু প্রয়োজন সাপেক্ষে কথা বলে উচিৎ, চুপ থাকা নয়। প্রয়োজনীয় কথা সাধারণত ও প্রধানত কম বা অল্প-ই হয়ে থাকে।
কম কথা, উচিৎ কথা, কথার সেরা কথা। কথায় আছে - বোবার শত্রু নাই। আসলে কাজের কথা অল্প হয়। আর 'পরচর্চা' বাদে (ছাড়া) কোনো কথাই দীর্ঘ হয়না। আর বর্তমানে 'পরচর্চা'র আরৎ হচ্ছে রাস্তা লাগোয়া চা-এর (চায়ের) দোকানগুলি।
পূর্ণ জ্ঞান হলে মানুষ চুপ হয়ে যায় :
লোকশিক্ষক পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণ দেব বিদ্যার সাগর ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, 'ব্রহ্ম অনুচ্ছিষ্ট''পূর্ণ জ্ঞান হলে মানুষ চুপ হয়ে যায়। বিচার করা যতক্ষণ না শেষ হয়, লোকে ফড় ফড় করে তর্ক করে, শেষ হলে চুপ হয়ে যায়। কলসি পূর্ণ হলে আর শব্দ হয় না। যতক্ষণ না কলসি পূর্ণ হয় ততক্ষণ শব্দ।'
আবার দেখবেন জ্ঞানী মানুষেরা কম কথাই বলেন। যেমন ধরুন আমরা যদি বলি - ঘোড়ার ডাক; জ্ঞানী বলবেন - হ্রেষা। হলনা কম কথা! একটা অংক কোনো বিজ্ঞ মনেমনে কষে নিমেশেই একটা শব্দে বা বাক্যে উত্তর বলে দিতে পারেন; কিন্তু আমাদের কাছে ওই অংকের সমাধান করতে বেশ কিছু সময় নিয়ে কষে একটা সাদাপাতা ফুরিয়ে যাবে! তাইতো বলে ফাঁকা কলসি বাজে বেশি। আর যে সৃষ্টি সম্পর্কে ভাবে, সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য খোঁজে, সৎ ও সত্য সন্ধানী, সারাক্ষণ নিজের অস্তিত্ব খোঁজে, বোঝে অন্যের দুঃখ-কষ্ট, মানে নিয়তি, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, আত্মসমালোচক, আত্মসম্মাণবোধ আছে সে আরও চুপ হয়ে যায়। কারণ, দোষারোপ করার কোনো জায়গা নেই, নিষ্ঠুর দুনিয়াতে কর্মই ধর্ম, দ্বীন দুনিয়া-তে কেউ কারো নয়, সব একলা, কেবলমাত্র এক আল্লাহ্-ই ভরসা (যিনি সর্বদা সর্বত্র বিরাজমান, তাঁর সঙ্গে সঙ্গোপনে স্বচ্ছ অন্তরে ও চোখের পানিতে কথা বলা যায়।), নিরতি বা বিধাতার লিখন কেউ খণ্ডন করতে পারেনা, নিষ্ঠুর বাস্তব ও বাস্তবের নির্মমতাও অবোধ বালকের মতো মেনে নিতে হয়, সব সময় নিজের দোষত্রুটির দিকে দৃষ্টিপাত, নিজের ভুলত্রুটির জন্য আত্মশোচনা, নিজের ব্যর্থতা বা অসামর্থতার প্রতি গভীর অনুশোচনা কথা বলার প্রাসঙ্গিকতা নষ্ট করে দেয়। ইসলাম - জাকজমক, অপচয়, গালাগালি, হিংসা, হাসি-ঠাট্টা-তামাশা, ঠকানো, দোষারোপ করা, গীবদ-কে বিন্দুমাত্র পশ্রয় দেয়না।
  সুতরাং, এতো আনন্দ ও (দীর্ঘ)কথা কীসের?